কিলিমানজারো অভিযানে এক পর্বতারোহীর অভিজ্ঞতা: স্টেলা পয়েন্ট থেকে আফ্রিকার বন্য প্রকৃতি পর্যন্ত
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১০
মাঝরাতে সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার পর প্রথম দিকে অন্ধকারে একা ও দিকভ্রান্ত লাগছিল। দিনের আলো, গাইডদের উত্সাহ এবং কাছাকাছি কয়েকজন সঙ্গীর উপস্থিতি আমাকে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার শক্তি দেয়। এরপর আবার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাঁটতে থাকি। কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর বিশ্রাম নিই। অন্যরা পাথরের ওপর বসে বিশ্রাম নিলেও আমি বড় একটি পাথরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিই।
পরবর্তী সময়ে আবার এগিয়ে চলি। ক্লান্ত পা টেনে টেনে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এই পথ কখনও শেষ হবে না। ঠিক তখনই অল্প দূরে কিছু মানুষের ছোট জটলা দেখি। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছাই।
৫ আগস্ট সকাল পৌনে নয়টায় আমি দাঁড়াই কিলিমানজারোর অন্যতম শিখর স্টেলা পয়েন্টে, যার উচ্চতা ৫,৭৫৬ মিটার।
আমাদের সবাই ক্লান্ত। কারও কারও ক্ষুধা। অণু তারেক জানায়, সে উহুরু পিক (৫,৮৯৫ মিটার) পর্যন্ত যেতে আগ্রহী নয়। আমি বলি, “সবার সিদ্ধান্তই সঠিক। যদি একজনও বাকি ১০০ মিটার যেতে চান, আমি সঙ্গ দিব। তবে নামার পথ কঠিন হবে।”
সবাই একমত হয়ে স্টেলা পয়েন্টে দাঁড়িয়ে গ্রুপ ছবি তুলি। পায়ের কাছে সামান্য তুষার। নিজেদের সঙ্গে থাকা খাবার—বাদাম, খেজুর, চকলেট, প্রোটিন বার ও বিস্কুট—খেয়ে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিই।
নামার সময় পাথরের গুঁড়ো ও ধুলিময় পথে ৪৫ ডিগ্রিতে নামা অত্যন্ত কষ্টকর। এরিক ও হাফিজ আমাকে পাশে ধরে সাহায্য করেন। বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে নামার সময় ভারসাম্য হারিয়ে দুবার পড়ে হাত ও পায়ে ব্যথা পাই। জামাকাপড়ের মধ্যে দিয়ে কনুই কেটে রক্ত বের হয়। তবে কিছুটা নামার পর উদ্দীপনা ফিরে আসে। যত নিচে নামি, অক্সিজেন সহজ ও স্বাভাবিক হয়।
ছয় দিনের ট্রেক শেষ করে ফেরার সময় তা দুই দিনে পার করি। ৫,৭৫৬ মিটার থেকে ৩,৮২০ মিটারে মিলেনিয়াল ক্যাম্প পর্যন্ত নামি। পথে বারাফু ক্যাম্পে লাঞ্চের জন্য থামি। আগের রাত ১২টা থেকে পরের রাত ৮টা পর্যন্ত ক্রমাগত হাঁটা—১,১০০ মিটার আরোহণের পর প্রায় দুই হাজার মিটার নামা। মুঠোফোনের স্টেপ অ্যাপ দেখায় ৩৭,২০০ স্টেপস।
পরের দিন পায়ের আঙুলে ক্ষত ও ব্যথা নিয়ে বৃষ্টিভেজা পথে বন ও বন্যপ্রাণী দেখার জন্য হাঁটা। নানা রঙের ফুল, পাখি, এবং কলোবাস বানরের দল চোখে পড়ে। গেটের কাছে পৌঁছে জাতীয় উদ্যানকে বিদায় দিই।
পরের চার দিন কেটেছে তারাঙ্গিরি ও সেরেঙ্গেটি জাতীয় উদ্যানে। গোরংগোরো ক্রেটারে আফ্রিকার অদ্ভুত দৃশ্য, বন্য প্রাণী ও ১৭৫ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। আরুশা শহরে কেটেছে কয়েক দিন—মাসাই কারুশিল্পের বাজার ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করে। সেই বিকেলে আমাকে কিলিমানজারো আরোহণের সার্টিফিকেট দেয়া হয়।
দেশে ফিরে অনেক দিন লিখতে পারিনি। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে ছবি ও গল্প ভাগ করে নিলাম। আফ্রিকার মানুষের মর্মবেদনা, সৌন্দর্য এবং কিলিমানজারোর একা দাঁড়ানো শিখরের দৃশ্য বোঝানো সহজ নয়। রাতের আকাশ, মলিন চাঁদ, মিটিমিটি জ্বলমান নক্ষত্রের নিচে দাঁড়ানো, তাঁবুর ভেতরে পাহাড়ের অসমতল মাটিতে শুয়ে ঘুম—সবকিছু স্মৃতিতে জমে আছে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।