প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে
তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ১৫:৫৪
বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে একের পর এক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ঘটনা ঘটছে। চীন সম্প্রতি তাদের চালকবিহীন মহাকাশযান চেইঞ্জ-৬ চাঁদের দুর্গম অঞ্চলে সফলভাবে অবতরণ করিয়ে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এটি এ ধরনের প্রথম ঘটনা। একই সময়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভোচারী সুনীতা উইলিয়ামস আবারও মহাকাশ অভিযানে গেছেন। এর আগে তিনি ২০০৬ ও ২০১২ সালে মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়ে মোট ৩২২ দিন মহাকাশে অবস্থান করেছিলেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার নভোচারী ওলেগ কোননেনকো মহাকাশে এক হাজার দিন থাকার রেকর্ড গড়েছেন। চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি চালকবিহীন পরিবহন বিমান সফলভাবে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও সম্পন্ন করেছে। এই বিমান কম খরচে বেশি মালামাল বহনে সক্ষম এবং বন ও তৃণভূমির আগুন নেভানো, ত্রাণ সামগ্রী পরিবহন কিংবা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মতো নানা কাজে ব্যবহার করা যাবে।
বর্তমানে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রযুক্তি কাজের গতি বাড়ায়, খরচ কমায় এবং নির্ভুলতা বৃদ্ধি করে। ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব দেশই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন মহলেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
তবে বিতর্ক থাকলেও প্রযুক্তির অগ্রগতি থেমে নেই। সামরিক ক্ষেত্র থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, অফিস, এমনকি গৃহস্থালিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর রোবট ব্যবহার বাড়ছে। অনেক দেশে বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার কাজেও রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রযুক্তিনির্ভর নানা নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
প্রযুক্তির সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ নতুন প্রজন্মের কম্পিউটারও বাজারে আসছে। এসব কম্পিউটারে সরাসরি অনুবাদ, ছবি তৈরি এবং কথোপকথনের মাধ্যমে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করার সুবিধা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ নতুন ডিভাইস বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। দক্ষ কর্মীর অভাব প্রযুক্তি ব্যবহারের বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থাও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব শক্তিশালী নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে প্রযুক্তি, ডিজিটাল লেনদেন, ইন্টারনেট ব্যবহার এবং স্টার্টআপ পরিবেশের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। অনেক মানুষ এখনও ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ নয়, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এই ঘাটতি বেশি।
ইন্টারনেটের গতি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশে এখনও অনেক এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছায়নি। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ব্যবসা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও দেশে বেশ কিছু তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ এখনও হয়নি।
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান খুব শক্ত নয়। আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন সূচকে দেশের অবস্থান অনেক নিচে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
এ জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত পাঠ্যসূচি হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
দেশব্যাপী উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা গেলে এবং প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটানো গেলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব। তারা দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিও বাড়বে।
বিশ্বে প্রযুক্তি পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে ডিজিটাল রূপান্তর খাতে বৈশ্বিক ব্যয় কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিশাল বাজারের সামান্য অংশও অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তাই দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সাইবার ঝুঁকি প্রতিরোধেও সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।