জয়শ্রী কবির: সাদাকালো দিনের পর্দার নীরব সৌন্দর্য আজ চিরস্মরণীয়
চিররঞ্জন সরকার | প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:০৪
বাংলাদেশ ও কলকাতার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের প্রিয় অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির আর নেই। গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনের রমফোর্ড নার্সিং হোমে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রস্থান যেন আমাদের যৌবনের, সাদাকালো দিনের এক স্মৃতি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি তৈরি করেছে।
গত শতকের আশির দশকে আমরা স্কুলের ছাত্র। তখন সিনেমাই ছিল বিনোদনের একমাত্র উৎস। মফস্বলে রঙিন টেলিভিশন দেখা মেলে না, কিছু সচ্ছল মানুষের ঘরে সাদাকালো টিভি ঢুকতে শুরু করেছিল মাত্র। ভিসিবি–ভিসিআর তখনও দুর্লভ।
সিনেমা হল আমাদের জীবনের প্রধান বিনোদন হলেও সেটি পেতে হত বড় সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। অভিভাবকের নিষেধাজ্ঞা, টিকিটের অভাব, সামাজিক নজর—সব মিলিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা ছিল কঠিন। তারপরও আমরা লুকিয়ে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতাম। সেই সময় সিনেমার গল্প, গান, মারপিট এবং নাটকীয়তা আমাদের কিশোরমনের প্রধান আকর্ষণ ছিল।
কিছু দিন পরে আমরা বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠি। বড়ভাইদের প্রভাবেই ভালো গল্প এবং সংযত অভিনয়ের সিনেমা খুঁজতে শুরু করি। সেই সময়ের আর্ট ফিল্মের একমাত্র ভরসা ছিল বিটিভি।
বিটিভির সাদাকালো দিনের স্মৃতি এখন রূপকথার মতো মনে হয়। ড্রয়িংরুমের এক কোণে রাখা বিশাল কাঠের বাক্সের ভেতর টেলিভিশন, ছাদের ওপর ঘোরানো এন্টেনা, ঝিরঝিরে পর্দার ফাঁক গলে আসা ঝাপসা ছবি—সব মিলিয়ে সিনেমা দেখা ছিল এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা।
কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে এক বড় ভাইয়ের বাসায় প্রথম দেখেছিলাম ‘রূপালী সৈকতে’। সিনেমা চলতে চলতে রাত দেড়টা-দুইটা বেজে যেত, কিন্তু তা সত্ত্বেও ছবির প্রভাব ছিল গভীর।
জয়শ্রী কবির তখনই আমাদের চোখে আলাদা হয়ে যান। তার অভিনয়ে চড়া মেকআপ বা অতিরঞ্জিত অভিনয় ছিল না। চোখের চাউনিতেই যেন কথা বলত অসংখ্য না বলা গল্প। ‘রূপালী সৈকতে’ দেখার পর ববিতার স্থান চলে যায়, সেখানে স্থান নেন জয়শ্রী কবির।
সিনেমার গল্পে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টান আর অপূর্ণতার গল্পে তিনি ছিলেন সমকালীন শিক্ষিত নারীর প্রতীক। নীরব দৃশ্যে তার অভিনয় ছিল শক্তিশালী—সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা দীর্ঘ শটগুলোতেই চরিত্রের ভেতরের সব প্রশ্ন ও সংযম ফুটে উঠত।
সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশে নির্মিত এই ছবিতে জয়শ্রী অভিনয় করেছেন শিক্ষিত, অভিজাত নারীর চরিত্রে। শহুরে জীবন ছেড়ে এক অচেনা বাস্তবতার মুখোমুখি চরিত্রে তার দৃঢ়তা এবং ভেতরের সংকল্প অসাধারণভাবে ফুটে ওঠে। বুলবুল আহমেদের সঙ্গে তার রসায়ন ছবিটির বড় শক্তি।
ছবির গান—‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার মৌনতারই সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর’—আজও বাজলে পর্দায় তার স্থির মুখখানা ভেসে ওঠে।
জয়শ্রী কবিরের জীবনও তার সিনেমার মতোই নীরব ও নাটকীয়। কলকাতার মেয়ে, ১৯৬৮ সালের মিস ক্যালকাটা—এই পরিচয়গুলোর মধ্যে দিয়ে তিনি অভিনয় জীবনের শুরু করেন সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ দিয়ে। উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’-এও তিনি বড় নায়কের ছায়ায় ঢাকা পড়েননি।
জয়শ্রী কবিরের অভিনয়ের মূল শক্তি ছিল চোখের ভাষা, নীরবতা এবং চরিত্রের ভেতরে বাস করা দক্ষতা। ১৯৭৫ সালে আলমগীর কবিরের সঙ্গে তার বিবাহ এবং পরে বিচ্ছেদ—সবই জীবন ও শিল্পের সংযোগের অংশ।
শেষ জীবনে তিনি লন্ডনে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, একমাত্র সন্তান লেনিন সৌরভ কবিরের সঙ্গে নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন। অভিনয় থেকে দূরে থেকেও শিল্পমন তাঁকে ছাড়েনি।
জয়শ্রী কবির চলে গেলেও রেখে গেছেন তার অভিনীত চরিত্র, দৃশ্য ও গানগুলো, যা সময়ের ধুলোয় মলিন হবে না। রঙিন, ঝলমলে আজকের সিনেমার যুগে ফিরে তাকালে সেই সাদাকালো দিনের জয়শ্রী কবির সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তার দীর্ঘ আড়াল, নীরব প্রস্থান আর মৃত্যুর পরের শূন্যতা—সব মিলিয়ে তিনি এক বিষণ্ণ, সুন্দর উপাখ্যান।
সূত্র: পরিবারের বরাত, চলচ্চিত্র আর্কাইভ
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।