সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২২ পৌষ ১৪৩২

ভেনেজুয়েলায় দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করল যুক্তরাষ্ট্র

ওয়াশিংটন/কারাকাস: | প্রকাশিত: ৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৮

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে একটি দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথম দেখায় এই পদক্ষেপ আকস্মিক মনে হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জটিল এই অভিযানের পরিকল্পনা চলছিল কয়েক মাস ধরে। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে মহড়া ও গোয়েন্দা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট বাহিনী মাদুরোর তথাকথিত ‘সেফ হাউস’-এর একটি হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করে সেখানে প্রবেশের অনুশীলন চালায়। অত্যন্ত সুরক্ষিত ওই বাসভবনে কীভাবে ঢোকা হবে, তা নিয়ে নিয়মিত মহড়া চলছিল।

একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফকে নিয়ে একটি ‘কোর টিম’ গঠন করা হয়। তাঁরা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বৈঠক ও ফোনালাপ করেন এবং প্রায়ই প্রেসিডেন্টকে সরাসরি অবহিত করতেন।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত আগস্ট থেকেই ভেনেজুয়েলায় একটি ছোট দল মোতায়েন করে। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও গতিবিধি সম্পর্কে গভীর তথ্য সংগ্রহ করে, যা অভিযানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া, সিআইএর একজন তথ্যদাতা মাদুরোর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানা গেছে। অভিযান চলাকালে তিনি মাদুরোর সঠিক অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন।

সব প্রস্তুতি শেষে চার দিন আগে অভিযানের অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে আবহাওয়া ও পরিষ্কার আকাশের জন্য অপেক্ষার পরামর্শ দেন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা।

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ট্রাম্প ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এ সময় ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো বাসভবনে উপদেষ্টাদের সঙ্গে অভিযানটির সরাসরি সম্প্রচার দেখেন।

পেন্টাগনের তত্ত্বাবধানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে ছিল—

  • ১টি বিমানবাহী রণতরি

  • ১১টি যুদ্ধজাহাজ

  • এক ডজনের বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান

  • মোট ১৫ হাজারের বেশি সেনা

এই মোতায়েনকে শুরুতে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

জেনারেল কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম গোলার্ধের ২০টি ঘাঁটি থেকে এফ-৩৫, এফ-২২ ও বি-১ বোম্বারসহ ১৫০টির বেশি বিমান অভিযানে অংশ নেয়।

শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ওই সময় মার্কিন যুদ্ধবিমান কারাকাস ও আশপাশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সব হামলাই সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল।

বিমান হামলার মধ্যেই ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন স্পেশাল ফোর্স কারাকাসে প্রবেশ করে। মাদুরোর অবস্থানস্থলের ইস্পাত দরজা ভাঙার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের সঙ্গে ছিল বিশেষ কাটিং যন্ত্র।

শনিবার ভোররাতে মার্কিন বাহিনী মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছালে সেখানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সেনারা বাসভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

সিএনএনের বরাতে জানা গেছে, অভিযানের সময় মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তাঁদের শোবার ঘর থেকেই আটক করা হয়। মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁদের টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হয়।

জেনারেল কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেফ হাউসে প্রবেশের পর মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। ট্রাম্প জানান, মাদুরো একটি ‘সেফ রুমে’ ঢোকার চেষ্টা করলেও দরজা বন্ধ করার আগেই তাঁকে আটক করা হয়।

অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হলেও কেউ নিহত হননি।

ভেনেজুয়েলার সীমানা ত্যাগের সময় মার্কিন বাহিনী একাধিক আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়ে জড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৩টা ২০ মিনিটে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজ জলসীমা অতিক্রম করে।

অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার সাত ঘণ্টা পর ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা নিকোলা মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করেন। পোস্টে তিনি লেখেন, “ইউএসএস আইডব্লিউও জিমায় নিকোলা মাদুরো।”



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top