মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২

দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত রাজনীতিকরণ ও বাংলাদেশ

মো: বজলুর রশীদ | প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১১

গ্রাফিক্স | নিউজফ্ল্যাশ সেভেন্টিওয়ান

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় এখানে সামাজিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বৈচিত্র্য স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক হলেও, রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে যখন জাতিগত পরিচয় সচেতনভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। একে বলা যায় জাতিগত রাজনীতিকরণ।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতিগত রাজনীতিকরণ কখনো মুক্তির পথ দেখিয়েছে, আবার কখনো বিভাজন ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলেও, বিষয়টি কেবল একটি দেশে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি উপমহাদেশজুড়ে রাষ্ট্র গঠন, গণতন্ত্রের বিকাশ ও ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

উপনিবেশ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা

ব্রিটিশ শাসনামলে জনগণকে ধর্ম, ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলো জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা করলেও, প্রায়শই একটি পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে অন্যগুলোকে প্রান্তিক করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ভাষা ও জাতিগত পরিচয় কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তা ভাষা আন্দোলনের উদাহরণে স্পষ্ট। পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় আন্দোলন শুরু হয়, যা রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকারবোধের জন্ম দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদাহরণ

  • ভারত: ভাষা, ধর্ম ও বর্ণভিত্তিক পরিচয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। এটি বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেয়, তবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও উত্তেজনাও সৃষ্টি করে।

  • শ্রীলঙ্কা: সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের আধিপত্য সংখ্যালঘুদের মধ্যে বঞ্চনাবোধ সৃষ্টি করে, যা সহিংস সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

  • নেপাল: নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় জনগোষ্ঠী স্বীকৃতি ও অংশগ্রহণ দাবি করে। এটি গণতান্ত্রিক পরিসর প্রসারিত করেছে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক টানাপড়েনও তৈরি করেছে।

  • পাকিস্তান: কেন্দ্রীয়করণ ও অসম বণ্টন জাতিগত অসন্তোষের কারণ, যা রাজনৈতিক আন্দোলন ও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।

জাতিগত রাজনীতিকরণের বৈশিষ্ট্য

  1. প্রায়ই বৈষম্য ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়।

  2. এটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ খুলে দিতে পারে, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে সামাজিক বিভাজন গভীর হয়।

  3. রাষ্ট্রের ভূমিকা নির্ণায়ক; সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি স্থিতিশীলতা আনে, দমনমূলক নীতি সঙ্কট দীর্ঘায়িত করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় পরিচয় ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। নাগরিকদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিলে তা রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপ নেবে।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণ

দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত রাজনীতিকরণ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। এটি ইতিহাস, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধান, বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা, ন্যায্য অর্থনৈতিক বণ্টন এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

উপসংহার:
জাতিগত রাজনীতিকরণ সঙ্কটের উৎসও হতে পারে, আবার গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির পথও খুলে দিতে পারে। কোন পথে এটি এগোবে, তা নির্ভর করে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর। দায়িত্বশীল নীতি ও পরিমিত দৃষ্টিভঙ্গি মাধ্যমে এই বাস্তবতাকে বিভাজনের নয়; বরং সহাবস্থান ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে রূপ দেয়া সম্ভব।

মো: বজলুর রশীদ

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top