ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ে কলকাতার সাহিত্য ও সংগীতাঙ্গন ছিল একতরফাভাবে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবাধীন। শ্যামাসংগীত ও কীর্তনের প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে মুসলিম সংস্কৃতি, জীবনাচার ও বিশ্বাস ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এমনকি অনেক মুসলিম শিল্পীকেও নিজেদের পরিচয় গোপন করে হিন্দু নাম ব্যবহার করে গান গাইতে হতো।
এই সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও সংকটের সময়েই আবির্ভাব ঘটে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর। তিনি শুধু সাহিত্যেই নয়, সংগীতেও ভেঙে দেন সব ধরনের ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও আধিপত্যের শৃঙ্খল।
ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয় তাঁর কালজয়ী ইসলামী সংগীত “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”—যা বাংলা সংগীতে ইসলামী ধারার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
খ্যাতিমান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, সে সময় উর্দু কাওয়ালির জনপ্রিয়তা দেখে তিনি নজরুলকে অনুরোধ করেন বাংলায় ইসলামী গান রচনার জন্য।
প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে নজরুল সম্মতি দেন। তবে বাধা হয়ে দাঁড়ান গ্রামোফোন কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভগবতী বাবু, যিনি নতুন ধারার এই গান নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। দীর্ঘ ছয় মাসের চেষ্টার পর অবশেষে পরীক্ষামূলকভাবে একটি গান রেকর্ডের অনুমতি মেলে।
এরপর একদিন চা ও পান নিয়ে নজরুলের কাছে হাজির হন আব্বাসউদ্দীন। নজরুল খাতা-কলম নিয়ে একটি কক্ষে ঢুকে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যেই লিখে ফেলেন ইতিহাসের সেই অমর গান।
গানটি রেকর্ড করা হয় দ্রুতই। রেকর্ডিংয়ের সময় নজরুল নিজেই হারমোনিয়ামে সুর তুলে শিল্পীকে গান শেখান।
ঈদের পর কলকাতায় ফিরে আব্বাসউদ্দীন দেখেন রাস্তাঘাট, ট্রাম, মাঠ সবখানেই মানুষের মুখে মুখে এই গান। অল্প সময়েই হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রি হয়ে যায়।
এই অভাবনীয় সাফল্য বাংলা সংগীতাঙ্গনের ধারা বদলে দেয়। আগে যেখানে মুসলিম শিল্পীরা হিন্দু নাম ব্যবহার করতেন, সেখানে পরবর্তীতে অনেক হিন্দু শিল্পী ইসলামী গান গাওয়ার জন্য মুসলিম নাম গ্রহণ করতে শুরু করেন।
এই একটি গানই শুধু নয়, এর মাধ্যমে শুরু হয় বাংলা ইসলামী সংগীতের এক নতুন যুগ। পরবর্তীতে নজরুলের কলম থেকে সৃষ্টি হয় অসংখ্য গজল, হামদ ও নাত, যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয়।
“ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে” কেবল একটি গান নয়- এটি বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক মাইলফলক।
মোসাদ্দেক হোসেন
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
ফোন: ০১৮৫১৬৮৬৮৯৮
[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। নিউজফ্ল্যাশ ৭১ মুক্তমত নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, নিউজফ্ল্যাশ ৭১ কর্তৃপক্ষের নয়। ]
পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।