বৃহঃস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ

শোক, উত্তরাধিকার ও বিএনপির সামনে নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা

নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬:৫৯

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যুর খবর জানানো হলে গোটা দেশ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রেস ব্রিফিংয়ের পরপরই হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হন দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। নীরব শোক আর চোখের জলে ভিজে ওঠে পরিবেশ। গত ২৩ নভেম্বর রাত থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, “খবরটা শোনার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। তাকে দেখার সুযোগ নেই, তবু সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। সবার চোখেই পানি।”

জানাজায় জনস্রোত, আন্তর্জাতিক উপস্থিতি

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার জানাজায় সারা দেশ থেকে বিএনপির লাখো নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে—খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

শোকের বাইরে রাজনৈতিক বার্তা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মৃত্যু শুধু আবেগঘন শোকের বিষয় নয়; এটি বিএনপির জন্য একটি সংকটময় রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত। দীর্ঘদিন অসুস্থ ও রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও খালেদা জিয়া ছিলেন দলের ঐক্যের চূড়ান্ত প্রতীক। সেই নেত্রীকে ছাড়াই এবার নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে বিএনপিকে।

তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দলটি পুরোপুরি প্রবেশ করল ‘খালেদা জিয়া-উত্তর’ যুগে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপির সব ক্ষমতা ও জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

উত্তরাধিকার ও নেতৃত্বের পরীক্ষা

দীর্ঘ সময় রাজনীতির সম্মুখভাগে অনুপস্থিত থাকলেও খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির নৈতিক ভারকেন্দ্র ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। তার উপস্থিতিই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঠেকিয়ে রেখেছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন আল জাজিরাকে বলেন, “বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারিয়েছে।” তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়ার নীতি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের অগ্রাধিকারগুলোই বাস্তবায়ন করবে।

তবে লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তিনি বলেন, “এখন সেই ছন্দে বিঘ্ন ঘটবে। তারেক রহমানকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে।”

বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবদ্ধ থাকলেও সেই সমীকরণ এখন ভেঙে গেছে। ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় রাজনৈতিক মাঠে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তিও বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, “খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের জন্য একজন স্থিতিশীল অভিভাবক। তার মৃত্যুতে রাজনীতিতে সেই অভাব স্পষ্ট হবে।”

তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব

তারেক রহমানের সাম্প্রতিক দেশে ফেরা দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির আশঙ্কা কমিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা স্বীকার করছেন, এই নেতৃত্বের পথচলা সহজ হবে না, তবে তারা আশাবাদী।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। তিনি কার্যকরভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।”

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনই নির্ধারণ করবে—তারেক রহমান কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে নেতা নন, নাকি জনগণের রায়ে প্রতিষ্ঠিত এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top