মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ভারতে এই প্রশ্ন উঠেছে—এই সংকটে নয়াদিল্লি কি কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে?
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ তৈরি করতে ইসলামাবাদ দ্রুত উদ্যোগ নেয়। গত সপ্তাহে পাকিস্তান ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পৌঁছে দেয় এবং আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাবও দেয়। যদিও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের সমর্থন চাইতে বেইজিং সফর করেন এবং পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
পাকিস্তানের এই সক্রিয়তায় ভারতের কৌশলগত মহলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুদ্ধরত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, ফলে নয়াদিল্লিও মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারত। এদিকে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস একে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কূটনৈতিক বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে পাকিস্তান তুলনামূলক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে অন্য একটি অংশ মনে করে, আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া এমন মধ্যস্থতা উদ্যোগ উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তাদের মতে, নীরব কূটনীতি ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখাই ভারতের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের এই ভূমিকাকে ‘দালালি’ হিসেবে উল্লেখ করে তা খারিজ করেছেন। তার মতে, ভারত নিজের কূটনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন এবং মধ্যস্থতার জন্য অন্যদের কাছে যেতে হয় না।
তবে ভারতের অভ্যন্তরে বিতর্ক থামছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু কৌশলগত নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি করেছে। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—পাকিস্তান যদি পারে, তাহলে ভারত কেন নয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত কখনোই সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার প্রতিযোগিতায় ছিল না এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া এমন ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনাও কম। তাদের ধারণা, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় স্থায়ী প্রভাব ফেলাও কঠিন।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের উচিত নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করা। সরাসরি মধ্যস্থতার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত শান্তি প্রচেষ্টায় মনোযোগ দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের এই সক্রিয়তার পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান ও ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এটি কেবল কূটনৈতিক প্রদর্শন নয়, বরং পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে নেওয়া পদক্ষেপও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান সংকট শুধু পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতাই নয়, বরং ভারতের ভূমিকা, কৌশল ও বৈশ্বিক প্রত্যাশা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।