মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২

নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৭:১৮

ছবি: সংগৃহীত

লন্ডনে প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসার দুই মাসও পূর্ণ হয়নি, এর মধ্যেই বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার জয়লাভের সম্ভাবনা প্রবল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো সঠিক হয় তাহলে বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী মৃদুভাষী তারেক রহমানের ভাগ্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজনে ২০০৮ সালে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান।

দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার দল বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ডিসেম্বরে বড়দিনে বীরের মতো স্বাগত পেয়ে দেশে ফিরেন তারেক রহমান।

অন্যদিকে হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন। তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন। এ ছাড়া তারেক রহমানের পিতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন। তিনি নিহত হওয়ার আগে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেন।

তারেক রহমান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কোনো একক দেশের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ না হয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলেছেন তিনি। এটি শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যিনি দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত ছিলেন।

তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্পে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা প্রস্তাব করেছেন।

কার্ডিওলজিস্ট (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ) স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত ঘটেছে যে, নিজের সময় কিভাবে কেটেছে তা ভাবারও সুযোগ পাননি বলে জানান তারেক রহমান।

বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কন্যা জায়মা রহমানকে পাশে নিয়ে তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের ফাঁকে বলেন, ‘আমরা দেশে আসার পর প্রতিটি মিনিট কিভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।’ তার মেয়ে জাইমা তার বাবার পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্ম তারেক রহমানের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হন।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমান নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন; যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে নিজের পরিবারের ওপর হওয়া নিপীড়নের ঊর্ধ্বে উঠে সামনে তাকাতে চান।

তারেক রহমান বলেছেন, ‘প্রতিশোধ কারো জীবনে কী নিয়ে আসে? প্রতিশোধের কারণে লোকদের এই দেশ থেকে পালাতে হবে। এতে ভালো কিছু হয়না।’ এই মুহূর্তে আমাদের দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দরকার বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতি মামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হন এবং অনুপস্থিতিতেই কয়েকটি মামলায় দণ্ডিত হন। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০১৮ সালে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি সব অভিযোগ বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন এবং হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় তিনি খালাস পান।

লন্ডনে বসে তিনি দেখেছেন, কিভাবে একের পর এক নির্বাচনে তার দল কোণঠাসা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা কারাগারে গেছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন, দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ফিরে তিনি সংযত ও পরিমিত ভাষায় কথা বলছেন, উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং সংযম ও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন—যা নতুন সূচনার আশায় থাকা বিএনপি সমর্থকদের উজ্জীবিত করেছে।

সূত্র: রয়টার্স



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top