খুনের শহরের বদনাম থাকলেও কমেছে হত্যাকাণ্ড
পাঁচ বছরে বগুড়ায় ৪০০ খুন, তবুও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে চরম উদ্বেগ
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২০
খুনের শহর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত বগুড়ায় পরিসংখ্যান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বছরজুড়ে খুনের আতঙ্ক, ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বগুড়ায় মোট ৫৭টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৯৫টি। সে হিসাবে এক বছরে খুন কমেছে ৩৮টি। তবে ২০২৩ সালে জেলায় খুন হয়েছিল ৭৭টি, ২০২২ সালে ৮৯টি এবং ২০২১ সালে ৮২টি। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে বগুড়ায় ৪০০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
কমেছে খুন, বেড়েছে আতঙ্ক
উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ জেলা বগুড়ায় খুনের সংখ্যা কমলেও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে তুচ্ছ ঘটনা, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও পারিবারিক কলহ প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
হঠাৎ করে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তা বেড়েছে। অনেকেই সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হতে কিংবা দিনের বেলাতেও একা চলাফেরা করতে আতঙ্ক বোধ করছেন।
উপজেলাভিত্তিক খুনের চিত্র
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, বগুড়ার ১২টি উপজেলায় ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল—
-
বগুড়া সদর: ১৪টি
-
শাজাহানপুর: ৭টি
-
শেরপুর: ৭টি
-
শিবগঞ্জ: ৪টি
-
গাবতলী: ৪টি
-
দুপচাঁচিয়া: ৪টি
-
নন্দীগ্রাম: ৪টি
-
কাহালু: ৩টি
-
সারিয়াকান্দি: ৩টি
-
ধুনট: ৩টি
-
আদমদিঘী: ২টি
-
সোনাতলা: ২টি
এ ছাড়াও জেলায় ১৪টি ডাকাতি ও ৩৫টি দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ড
২০২৫ সালে বগুড়ায় সংঘটিত কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ড—
-
১ মার্চ: সদর উপজেলার সাবগ্রামে ঘরে ঢুকে আনোয়ারা বেগম (৫৮) ও তার মেয়ে সকিনা (৩৫)-কে কুপিয়ে হত্যা।
-
১৫ জুন: স্কুলছাত্রী মেয়েকে বিয়ে করতে না দেওয়ার জেরে শাকিল আহমেদ (৪০)-কে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা।
-
১৬ জুলাই: ইসলামপুর হরিগাড়ীতে রাতে দুই নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, একজন আহত।
-
১৬ সেপ্টেম্বর: শিবগঞ্জে কুয়েতপ্রবাসীর স্ত্রী রানী বেগম ও ছেলে ইমরান হোসেনকে হত্যা।
-
২৮ অক্টোবর: শহরের সেউজগাড়ীতে হাবিবুর রহমান খোকন (৩৫) কুপিয়ে নিহত।
-
৬ নভেম্বর: কাহালুতে নেশার টাকার জন্য সৎ বাবাকে হত্যা।
-
২৫ নভেম্বর: শাজাহানপুরে এক সেনাসদস্যের দুই সন্তানের গলাকাটা ও স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
বগুড়ার বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুল ওহাব বলেন,
“রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে বগুড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তাতে সেই অধিকার মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন জানান,
“সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতার কারণে খুনের ঘটনা বাড়ছে। এ দায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এড়াতে পারে না।”
পুলিশের বক্তব্য
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) হুসাইন মোহাম্মদ রায়হান ইসলাম বলেন,
“রাজনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে অপরাধ দমন সম্ভব নয়।”
তিনি জানান, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে এবং সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।