চট্টগ্রামে ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ; তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর
জোবায়ের হোসেন | প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৯:৫৬
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)–এর চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্যতা এবং নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের একাধিক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।
পিআইওর গোপন প্রতিবেদন
জানা গেছে, সিএমপির পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং থানায় দায়িত্ব পালনের সময়কার নানা অনিয়মের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও অডিও রেকর্ডসহ পাঁচ পৃষ্ঠার একটি গোপন প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দিয়েছে পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) ইউনিট। প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি গণমাধ্যমের হাতেও এসেছে।
ডবলমুরিং ও পাহাড়তলী থানা সূত্র জানায়, ওসি বাবুল আজাদ বদলির সময় সেলিম সরকারসহ কয়েকজন এএসআই ও এসআইকে সঙ্গে নিয়ে যান, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সদর দপ্তর থেকে প্রতিবেদনটি নগর পুলিশে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। তবে সিএমপি কমিশনারের সঙ্গে ওসির সুসম্পর্ক থাকায় প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ দিতে সাহস পাননি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পুনরায় হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী তদন্ত কর্মকর্তার কাছেও সাক্ষ্য দেননি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ বলেন, সদর দপ্তর থেকে বাবুল আজাদের বিষয়ে একটি তদন্ত এসেছিল। তার পূর্বসূরি সদ্য বিদায়ী অতিরিক্ত কমিশনার হুমায়ুন কবির তদন্ত করে প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনের বিস্তারিত সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।
‘টাকা না দিলে একাধিক মামলায় চালান’
পিআইও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদামতো টাকা দিলে একটি মামলায় চালান দেওয়া হতো, আর টাকা না দিলে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে হয়রানি করা হতো।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর উত্তর আগ্রাবাদ এলাকা থেকে সাগির আহমদ নামে এক ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয়ে আটক করে ডবলমুরিং থানায় নেওয়া হয়। চারটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখিয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার কাছে মোট ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। আংশিক টাকা দেওয়ার পর তাকে একটি মামলায় চালান করা হয়।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে মনসুরাবাদ এলাকায় বিকাশ এজেন্ট এমরান হোসেন শাকিলকে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে থানায় নেওয়া হয়। পরে তার স্ত্রীর কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ওয়ার্ড মেম্বার ও বিএনপি নেতার অভিযোগ
পাহাড়তলী থানায় দায়িত্ব পালনকালে মিরসরাই উপজেলার এক ওয়ার্ড মেম্বারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা এবং তার সহযোগীর কাছ থেকে বিকাশে ৫১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৭ মার্চ হালিশহর নয়াবাজার এলাকা থেকে সলিম উদ্দিন ও আলী হোসেনকে তুলে নিয়ে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ওয়ার্ড মেম্বার সলিম বলেন, নগরে তার নামে কোনো মামলা নেই। থানা পোড়ানোর মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় চালান দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হয়। বাধ্য হয়ে দুই লাখ টাকা দেওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া, পাহাড়তলী ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুব আলমকে চাঁদা না দেওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আসামি করার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। তার দাবি, দুই লাখ টাকা নেওয়ার পর দুর্গাপূজা উপলক্ষে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
"আটক ও টাকার বিনিময়ে মুক্তি"
গত ১১ জুলাই নগরীর মোগলটুলী মোড় থেকে সাত যুবককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বাকি দুজনকে মামলায় চালান করা হয়।
এ ছাড়া, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর চৌমুহনী কর্ণফুলী মার্কেট এলাকা থেকে এক যুবককে তুলে নিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক বলেন, বন্ধুর সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাকে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয়। পরে পরিবার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে।
"জুয়ার আসর ও মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে মাসিক আদায়ের অভিযোগ"
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডবলমুরিং থানায় দায়িত্ব পালনকালে পানওয়ালা পাড়ার একটি জুয়ার আসর থেকে এএসআই সেলিম সরকারের মাধ্যমে মাসে এক লাখ টাকা নেওয়া হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন স্পটে মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তালিকাভুক্ত ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসি বাবুল আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সিএমপির পশ্চিম জোনের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে ডিসি-দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।