ঋণখেলাপিরা এখন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে এবং তারাই সংস্কার প্রক্রিয়ার বড় বাধা—এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, সমস্যাটি কোনো ব্যক্তি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার ভেতরে প্রোথিত একটি কাঠামোগত সংকট।
রোববার রাজধানীতে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে আইন প্রণয়ন, এরপর প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বশেষ ফলাফল মূল্যায়ন—এই পুরো চক্র সম্পন্ন না হলে কোনো সংস্কারই সফল হয় না।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, দলগুলোর ভেতরে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব ও আন্তরিকতা স্পষ্ট নয়। এমনকি অনেক নেতাকর্মী নিজেদের ইশতেহার সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বড় ধরনের সংস্কার তখনই সফল হয় যখন তা জনগণের শক্তিশালী সমর্থন পায়। তবে বর্তমানে সেই ধরনের গণভিত্তিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা আইন পাস নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়ন—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কারের মতো উদ্যোগের সফলতা যাচাই করতে হলে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব চিত্র দেখতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রস্তাব নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সংস্কার নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অর্থ ছাড় পাওয়ার জন্য কিছু অগ্রগতি দেখানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব সীমিত থাকে।
পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমানে শুধু ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়, কিন্তু সেই ব্যয়ে কী ফলাফল এসেছে তার বিশ্লেষণ থাকে না।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দ থাকলেও অনেক সময় তা পুরোপুরি ব্যবহার হয় না। ফলে জনগণ নিম্নমানের সেবা পাচ্ছে এবং শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বড় সংস্কার এসেছে শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিভক্ত থাকায় ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি হচ্ছে না।
এক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, সংস্কার বাস্তবায়নে নজরদারি এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।
সংস্কারের সফলতা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর—এমন মন্তব্য করে তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিনই থেকে যাবে।
পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।