ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: আজও অধরা বিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক | কুড়িগ্রাম | প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫২

ছবি: সংগৃহীত

আজ ৭ জানুয়ারি। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)–এর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয় ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানী খাতুন। হত্যার পর দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে ছিল তার নিথর দেহ—যা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক মর্মান্তিক প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঘটনার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। তবে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের দুই দফা বিচারিক রায়ে বিএসএফের বিশেষ আদালত অভিযুক্ত সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। আজ ১৫ বছর পার হলেও ফেলানী হত্যার বিচার এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার মেয়েকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। দুই দেশের মাটিতে কত রক্ত ঝরেছে। ১৫ বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার পেলাম না। আজও বিচারের অপেক্ষায় আছি।”

হতাশা প্রকাশ করে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন,
“১৪ বছর পেরিয়ে ১৫ বছরে পড়লাম, তবুও বিচার পেলাম না। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা নিয়া গেলাম, কয়েকবার শুনানির তারিখ দিয়েও পিছিয়ে গেছে। এখন আর কোনো খবরও পাই না। ফেলানীর বিচার হলে সীমান্তে মানুষ মরত না। মরার আগে আমি বিচারটা দেখে যেতে চাই।”

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম পরিবারসহ ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার সময় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার টপকানোর চেষ্টা করে ফেলানী।

এ সময় বিএসএফ সদস্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারের ওপর ঝুলে ছটফট করতে করতেই মৃত্যু হয় কিশোরী ফেলানীর। সকাল পৌনে ৭টা থেকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে তার নিথর দেহ।

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের আবেদন করেন ফেলানীর বাবা।

২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলেও ২০১৫ সালের ২ জুলাই আবারও অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। পরে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহযোগিতায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির তারিখ থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে সেটিও হয়নি। এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন,
“ফেলানী হত্যার মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন,
“ভারতের আন্তরিকতার অভাবে ফেলানী হত্যার বিচার হচ্ছে না। বিচার হলে সীমান্ত হত্যার ঘটনা কমে আসত। ভারতের উচিত দ্রুত এই মামলার নিষ্পত্তি করা।”



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top