সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাগেরহাটের চার আসনে বদলে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ

বাগেরহাট প্রতিনিধি | প্রকাশিত: ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫১

বাগেরহাট-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলামের প্রচারনা।।  ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় বাগেরহাট জেলার চারটি আসনের ভোটের হিসাব–নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপিকে তিনটি আসনে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সামলানোর চ্যালেঞ্জে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে পুরনো আসন পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নতুন আসন দখলের আশায় মাঠে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী।

বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন বাদ দিলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়—একটিতে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়, দুটিতে আওয়ামী লীগ–জামায়াত এবং একটিতে আওয়ামী লীগ–বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাট–৪ আসনে জামায়াতের জয়ের ইতিহাস রয়েছে, বাগেরহাট–৩ আসনে কয়েকবার দ্বিতীয় হয়েছে দলটি। বাগেরহাট–২ আসনেও এবার জামায়াত মূল লড়াইয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপির নেতারা দাবি করছেন, দল ঐক্যবদ্ধ এবং চারটি আসনেই জয়ী হবে তারা। অন্যদিকে জামায়াত বলছে, অতীতের সাফল্য তাদের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছে।

চারটি আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা নতুন মুখ। জামায়াতের চার প্রার্থীর মধ্যে দুজন নতুন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জেএসডি, মুসলিম লীগসহ মোট ২৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনে দলটি অংশ নিচ্ছে না।

বাগেরহাট–১: ‘নির্ধারকের ভূমিকায়’ সনাতনী ভোট

চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে দলটি না থাকায় এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিএনপি এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা সনাতনী ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মোট ভোটার: ৩,৭৫,৫৬০ জন (পুরুষ ১,৯০,৮৩৮; নারী ১,৮৪,৭২০; হিজড়া ২)।

বাগেরহাট–২: ‘বিদ্রোহে কুপোকাত’ বিএনপি

সদর ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস। বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, জামায়াতের শেখ মনজুরুল হক রাহাদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম ভোটের মাঠে সক্রিয়। বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি জামায়াতকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
মোট ভোটার: ৩,৩৮,০০৯ জন (পুরুষ ১,৬৭,৭৩৯; নারী ১,৭০,২৬৫; হিজড়া ৫)।

বাগেরহাট–৩: প্রথম হতে চায় জামায়াত

মোংলা ও রামপাল উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে আগে বিএনপি–জামায়াত জোট থাকলেও এবার আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুই দল। বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম, জামায়াতের মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ। অতীতের নির্বাচনে জামায়াত দ্বিতীয় হলেও এবার প্রথম হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে।
মোট ভোটার: ২,৬৬,৮৬৪ জন (পুরুষ ১,৩২,৩৫০; নারী ১,৩৪,৫১০; হিজড়া ৪)।

বাগেরহাট–৪: খাতা খুলতে চায় বিএনপি

মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা নিয়ে এ আসনে অতীতে আওয়ামী লীগ–জামায়াতের লড়াই বেশি দেখা গেলেও এবার বিএনপি নতুন করে শক্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াতের আব্দুল আলীম আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া।
মোট ভোটার: ৩,৮০,৬৭৮ জন (পুরুষ ১,৯১,৮১২; নারী ১,৮৮,৮৬৩; হিজড়া ৩)।

জামায়াতের অবস্থান

জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির রেজাউল করিম বলেন, চারটি আসনেই তাদের প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় এবং অতীতের জয়ের ইতিহাস তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

বিএনপির অবস্থান

জেলা বিএনপির নেতারা দাবি করছেন, দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করছে এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের কারণে কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকই মূল ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমের দাবি, তিনি মাঠে না থাকলে অন্য দল জয়ী হবে এবং এই নির্বাচন তার জনপ্রিয়তার পরীক্ষাও বটে।

সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসনেই জমে উঠেছে বহুমুখী রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে দলীয় ঐক্য, বিদ্রোহী প্রার্থী ও সংখ্যালঘু ভোট—সবই হয়ে উঠেছে নির্ধারক ফ্যাক্টর।

 
 


বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top