প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ানোর নামে ৪৫ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৬
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলে তড়িঘড়ি করে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি–পিইডিপি-৫’ নামে নতুন এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন আগের কর্মসূচি পিইডিপি-৪ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং দেশ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা খাতে আরেকটি বড় বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আগামী পাঁচ বছরে বিদ্যমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাইরে পিইডিপি-৫ বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য, টেকসই ও উচ্চমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি শিশুকে শক্ত ভিত্তিগত সাক্ষরতা ও গণিতে দক্ষ করে একুশ শতকের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি), ব্যয় কাঠামো, অতীত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সূচক বিশ্লেষণে সংশয় দেখা দিয়েছে—এই প্রকল্প কি সত্যিই শেখার সংকট কাটাতে পারবে, নাকি আগের ব্যয়বহুল কিন্তু ফলহীন প্রকল্পগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে?
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন,
“প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো হচ্ছে, কিন্তু শিশুরা শিখছে না। পিইডিপি-৫ আরএডিপিতে নেওয়ার তাড়া দেখা যাচ্ছে, অথচ সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই।”
ডিপিপি অনুযায়ী, পিইডিপি-৫ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। অর্থায়নের বড় অংশ বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণনির্ভর। পাশাপাশি ইউনিসেফ, জাইকা, জিপিই, ইউনেসকোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অনুদানও থাকবে। অর্থাৎ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বাড়বে বৈদেশিক ঋণের বোঝা।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলায় ৭০ শতাংশ এবং গণিতে যথাক্রমে ৬০ ও ৫০ শতাংশ দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া—
-
প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে শতভাগ নিট ভর্তি,
-
ঝরে পড়ার হার ১৬.২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো,
-
শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৯৩ শতাংশে উন্নীত করা,
-
একক শিফট স্কুলে পাঠদানের সময় ২০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আগের চারটি পিইডিপিতেও প্রায় একই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অথচ গত এক যুগে তৃতীয় ও চতুর্থ পিইডিপিতে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও শেখার মানে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়া ও গণিতে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। জরিপে দেখা যায়—
-
মাত্র ২৪ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে,
-
ছোটগল্পের ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে ৩৯ শতাংশ,
-
গণিতে মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর।
ডিপিপি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, প্রকল্পের বড় অংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক খাতে। প্রায় ২৫ হাজার একক শিফট স্কুল বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু নন-রেসিডেনশিয়াল ভবন নির্মাণেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা ও শেখার ফলাফল মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ফলাফল কাঠামো স্পষ্ট নয়। আগের পিইডিপিতে প্রশিক্ষণ থাকলেও শ্রেণিকক্ষে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি—এই বাস্তবতা নতুন ডিপিপিতে যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন,
“প্রশাসনিক মনিটরিং থাকলেও একাডেমিক মনিটরিংয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া অনেক প্রকল্প শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে কার্যকর হয়নি।”
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন,
“মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোর চেয়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া জরুরি। শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।”
সব মিলিয়ে, পিইডিপি-৪-এর ব্যর্থতার গভীর বিশ্লেষণ ছাড়াই আরও বড় আকারে পিইডিপি-৫ গ্রহণ করায় শিক্ষা খাতে অপচয় ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।