বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ভয়াবহ সহিংসতা, নিহত ১২ থেকে ২০ হাজারের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:২১

ছবি: সংগৃহীত

ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো সহিংসতা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানের ভেতর ও বাইরে থাকা একাধিক সূত্র সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে তারা ধারণা করছে।

দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও টেলিফোন যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সম্প্রতি কিছু ফোনলাইন আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর দেশটির ভেতর থেকে যেসব তথ্য আসছে, তাতে পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত নিহতদের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশ করেনি ইরান সরকার। রয়টার্স–এর খবরে বলা হয়েছে, এক ইরানি কর্মকর্তা নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার বলে দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সহিংসতার জন্য ‘বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেন।

অন্যদিকে, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, যুক্তরাজ্য সরকারের ধারণা অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা অন্তত ২ হাজার হতে পারে, তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বিরোধী গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ হাজারের নিচে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

সিবিএস নিউজ যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের কাছাকাছি একটি মর্গে ৩৬৬ জনের বেশি মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে। অনেক মরদেহে গুলির চিহ্ন, শটগানের আঘাত এবং গুরুতর ক্ষত স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

ভিডিওতে ফরেনসিক কর্মীদের মরদেহগুলোর ছবি তুলতে এবং বাইরে স্বজনদের নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ করতে দেখা যায়।

একজন ইরানি অ্যাক্টিভিস্ট জানান, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ভিডিওটি বাইরে পাঠাতে একজন ব্যক্তিকে প্রায় ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইরানের ভেতরের একটি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের চাপ দিচ্ছে। আহত বিক্ষোভকারীদের নাম ও ঠিকানা দিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এ কারণে অনেক আহত ব্যক্তি হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন, ফলে চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

নরওয়েভভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস–এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, তাদের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী দমন-পীড়নের মাত্রা কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ।

তিনি বলেন,

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে পুরো দেশকে কার্যত একটি নির্জন কারাগারে পরিণত করা হয়েছে।”

সংগঠনটি একটি ভিডিও পাওয়ার কথা জানিয়েছে, যেখানে উত্তর ইরানের মাজান্দারান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৭৫ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে সূত্রের নিরাপত্তার কারণে নির্দিষ্ট স্থান প্রকাশ করা হয়নি।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে হঠাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ইরানের সব ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে—যদিও কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।

মানবাধিকার কর্মী আমিরি-মোগাদ্দামের মতে, ইরানের জনগণ শাসকগোষ্ঠীর ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সরাতে পারে—এমন যে কাউকেই তারা সমর্থন করতে প্রস্তুত।

এদিকে, নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি দাবি করেছেন, তিনি ইরানের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপই আরও প্রাণহানি ঠেকানোর একমাত্র উপায়।

দেশজুড়ে এখনও ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বন্ধ থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জানতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী স্পষ্ট—ইরান ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়তে পারে।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top