মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? সামরিক শক্তিতে কে কতটা এগিয়ে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০৩

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বহু বছরের ছায়া-সংঘাত এবার প্রকাশ্য সামরিক মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিয়েছে। একদিকে ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরান; আর পেছনে কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আকাশপথে চালকবিহীন উড়োজাহাজ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার আক্রমণ ও গোয়েন্দা তৎপরতায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন এখন- এই সংঘাত কোন দিকে গড়াবে? সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে?

সামরিক সক্ষমতায় তুলনামূলক চিত্র-

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে ইসরায়েল অনেকাংশে এগিয়ে। দেশটির আধুনিক যুদ্ধবিমান বহর, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা রয়েছে। বহিস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে দূরপাল্লার আক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতাও তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে ইরান জনবল ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের দিক থেকে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রয়েছে, যা পরোক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। সরাসরি লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত সাইবার ও প্রক্সি কৌশলও ব্যবহার করতে পারে তেহরান।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আকাশযুদ্ধে ইসরায়েল এগিয়ে থাকলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাববলয়ে ইরান উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ফলে একতরফা বিজয় সহজ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা-

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সম্পৃক্ত হলে শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সামরিক সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ ও কৌশলগত সমর্থন ইসরায়েলের পক্ষে বাড়তি সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এতে সংঘাত আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের শঙ্কা-

আধুনিক রাষ্ট্রযুদ্ধে দ্রুত ও পরিষ্কার বিজয় এখন বিরল। বরং পাল্টাপাল্টি আঘাত, সীমিত পরিসরের হামলা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা—এমন চিত্রই বেশি দেখা যায়। ইরান–ইসরায়েল সংঘাতও সেই পথে এগোতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদি উভয় পক্ষ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে সীমিত হামলা চালিয়ে যায়, তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানই শেষ ভরসা হয়ে উঠবে।

মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা-

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। বড় শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়লে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়বে। এছাড়াও সংঘাত দীর্ঘ হলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, স্বল্প সময়ের সংঘাতেও ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রভাব: বিশ্ববাজারে অস্থিরতা-

ইরান আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা ও মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। নতুন যুদ্ধ সেই অর্থনৈতিক সংকট গভীর করতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে এশিয়া, ইউরোপসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও নিত্যপণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাবে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্র-

১. আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যস্থতায় দ্রুত যুদ্ধবিরতি।
২. সীমিত পরিসরে দীর্ঘস্থায়ী হামলা–পাল্টা হামলা।
৩. আঞ্চলিক বিস্তার, যেখানে অন্য রাষ্ট্র বা শক্তি সরাসরি যুক্ত হতে পারে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট যে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে স্পষ্ট বিজয়ীর সম্ভাবনা কম। সামরিক শক্তিতে উভয় পক্ষের নিজস্ব সুবিধা থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিই বেশি প্রকট হয়ে উঠবে।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top