মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ৩০ পৌষ ১৪৩২

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে ভোলার তরুণের উদ্ভাবন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ২০:৫৪

সংগৃহীত

নদী বেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলায় প্রতি বছর পানিতে ডুবে অসংখ্য শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বরিশাল বিভাগে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ, যার মধ্যে ভোলা অন্যতম। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় আশার আলো জ্বালিয়েছেন ভোলার এক তরুণ উদ্ভাবক।

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু ঠেকাতে ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ নামে একটি অভিনব ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন ভোলার মনপুরা উপজেলার তরুণ শিক্ষার্থী তাহসিন। ডিভাইসটি দেখতে ছোট লকেটের মতো, ওজন মাত্র দুই গ্রাম। শিশুর গলায় ঝুলিয়ে রাখা এই ডিভাইস পানির সংস্পর্শে এলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক সংকেত পাঠাবে।

গত ৬ জানুয়ারি মনপুরা উপজেলার একটি পুকুরে পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী আরিশা নামের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এলাকাবাসীকে আবারও নাড়া দেয়। এর আগেও একই পরিবারের দুই শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিল। একই পরিবারের তিন শিশুর এমন করুণ মৃত্যু তাহসিনকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। সেই শোক থেকেই তিনি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে কার্যকর সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নেন।

তাহসিন জানান, প্রায় আট থেকে নয় মাস গবেষণার পর তিনি ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’টি তৈরি করতে সক্ষম হন। ডিভাইসটি শিশুর সঙ্গে থাকলে শিশু অসাবধানতাবশত পুকুর বা জলাশয়ে পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে থাকা একটি রিসিভারে সংকেত পাঠাবে। তখন সাইরেন বেজে উঠবে এবং একই সঙ্গে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল যাবে। চাইলে জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুটি কোথায় পানিতে পড়েছে সেই লোকেশনও জানা যাবে।

ডিভাইসটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে তাহসিন বলেন, পানির সংস্পর্শে এলে পানিতে থাকা মুক্ত ইলেকট্রন সামান্য বিদ্যুৎ পরিবহন করে সুইচের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমেই সংকেত রিসিভারে পৌঁছে সতর্কতা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়।

তাহসিন ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনার চর গ্রামের ক্বারী আব্দুল হালিম মিয়ার ছেলে। তিনি ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। তার বাবা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই বাবার সার্বিক সহযোগিতায় বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উদ্ভাবনী কাজে যুক্ত ছিলেন তাহসিন।

তাহসিন জানান, ডিভাইসটি তৈরি করতে তার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা গেলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যেই বাজারে আনা সম্ভব হবে।

তাহসিনের বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম বলেন, “ছোটবেলা থেকেই তাহসিন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে গবেষণা করে আসছে। তার এই উদ্ভাবন ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।”

তাহসিনের উদ্ভাবনকে স্বাগত জানিয়ে ভোলা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ডিভাইসটি বাজারজাত করার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, “এত ছোট একটি ডিভাইসের মাধ্যমে শিশুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব—এটি সত্যিই অভাবনীয়। ভোলাসহ সারাদেশে ডিভাইসটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার জন্য তাহসিনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে তাহসিনের তৈরি ১৫টি প্রকল্প বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছেন।

 

এনএফ৭১/ওতু



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top