‘দিদি’ থেকে অগ্নিকন্যা, কে এই মমতা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ৪ মে ২০২৬, ১৯:৪৪

সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টানা তিন দফা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেত্রী কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং এক সংগ্রামী প্রতীকে পরিণত হয়েছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ‘দিদি’ বা ‘অগ্নিকন্যা’—যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত গড়ে উঠেছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। খুব অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ১৭ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়, যা তার মানসিক দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই সময় থেকেই আত্মনির্ভরতা ও সংগ্রাম তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাজপথে এক সাহসী তরুণীর প্রতিবাদ নজর কাড়ে সবার। কলেজ স্ট্রিটে জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির সামনে উঠে প্রতিবাদ জানানোর ঘটনাটি তাকে প্রথমবার জনসমক্ষে পরিচিত করে তোলে। সেদিনের সেই তরুণীই আজকের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। কলকাতার জোগমায়া দেবী কলেজে পড়াকালীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দেন এবং কংগ্রেস রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রবীণ বাম নেতা সোমনাথ চ্যাটার্জি-কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ১৯৯৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, যা পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পি ভি নরসিমা রাও সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের রেলমন্ত্রী হন। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক জোট বদল, মন্ত্রিত্ব ত্যাগ এবং পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা নাটকীয়তায় ভরা।

মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে। শিল্পায়নের নামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ২০০৬ সালে সিঙ্গুরে দীর্ঘ অনশন এবং ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহতদের ঘটনায় তার নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনগুলোই ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে তাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো সামাজিক প্রকল্প চালু করেন, যা বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বাড়ায়।

তবে তার শাসনামল সমালোচনামুক্ত নয়। দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। তার দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। এসব অভিযোগকে তিনি বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।

বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টি পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে এবং নির্বাচনী লড়াইকে করেছে আরও কঠিন। ভোটের প্রাথমিক প্রবণতায় পিছিয়ে থাকলেও মমতা এখনও লড়াই ছাড়তে নারাজ। তিনি দলীয় কর্মীদের গণনাকেন্দ্রে থাকার নির্দেশ দিয়ে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, অনেক আসনে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার প্রমাণ করেছেন যে সংকটই তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। রাজপথের আন্দোলন থেকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব—সব জায়গায় তিনি নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। এখন দেখার বিষয়, এই অভিজ্ঞ নেত্রী আবারও কি প্রতিকূলতা জয় করে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন অধ্যায়।

 

এনএফ৭১/ওতু



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top