মাদুরো দম্পতিকে যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণ: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সংঘাতের সূচনা
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৯
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাঞ্চল্যকর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটিকে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে—কোনো আন্তর্জাতিক সম্মতি ছাড়াই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে এমন সামরিক অভিযান চালানোর আইনি ভিত্তি কী?
এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাশিয়া, চীনসহ একাধিক দেশ এর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই নজির ভবিষ্যতে আরও সংঘর্ষ ও অস্থিরতার পথ খুলে দিতে পারে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তার বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়।
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, এটি একটি মাদকবিরোধী অভিযান। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরো সরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক কোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।
তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানায়, তারা ভেনেজুয়েলার শাসনভার নিয়েছে এবং ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিবেচনাপূর্ণ’ রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন শাসন কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। ভেনেজুয়েলাকে আমরা চালাব।”
কিন্তু কীভাবে এই শাসন পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ—বিশেষ করে তেল।
ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল রিজার্ভ, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ। জাতীয়করণ নীতির কারণে এতদিন মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল। কেবল শেভরন বিশেষ ছাড়ে সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তেল খাত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে বলেই অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র-সম্পৃক্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
একই মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন মাদুরোর ছেলে, ভেনেজুয়েলার কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী এবং কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’-এর নেতারাও।
তবে ভেনেজুয়েলা ও একাধিক দেশ একে ‘রাজনৈতিক অপহরণ’ বলেই অভিহিত করছে।
ম্যানহাটনের আদালতে বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর মাদুরো বলেন, “আমি নির্দোষ। আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট। আমাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে।”
তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালত আগামী ১৭ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাদা নিরাপত্তা পরিষদে বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্র অবৈধভাবে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আমাদের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করেছে।”
তিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।
মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,
“দেলসি যদি সঠিক কাজ না করেন, তার পরিণতি মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ হবে।”
এই মন্তব্য ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ওপর সামরিক বাধা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির চারপাশে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল চলছে।
এই ‘কোয়ারেন্টাইন’ নীতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন চাইছে, ভেনেজুয়েলা যেন তাদের তেল খাত খুলে দেয় মার্কিন ও পশ্চিমা বিনিয়োগের জন্য।
চীন, রাশিয়া ও ইরান এই অভিযানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় এসব দেশের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থাকায় তারা আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ সরকার গঠিত হলে তাদের প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন কারাগারে মাদুরো দম্পতির বন্দি অবস্থান নিয়েও মানবাধিকার প্রশ্ন উঠেছে। ২৩ ঘণ্টা একাকী সেলে রাখা, সীমিত স্নান ও ব্যায়ামের সুযোগ—এসবকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছেন অনেকে।
এই ঘটনা শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, পুরো লাতিন আমেরিকা ও বিশ্ব রাজনীতিতে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কিছু সমালোচনা থাকলেও বড় কোনো রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়েননি ট্রাম্প।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং ভেনেজুয়েলার ঘটনা মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশসহ বহু দেশ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনা সহজে প্রশমিত হবে না—বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।