দুর্গম চরাঞ্চলে প্রসূতি মায়েদের ভরসা ডিপ্লোমা ডাক্তার ফাতিমা আক্তার রিমা
নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২৬, ১৪:১৬
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের হাজারো প্রসূতি মায়ের কাছে এখন আস্থার নাম ডিপ্লোমা ডাক্তার ফাতিমা আক্তার রিমা। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সংকটের মধ্যেও গত দুই বছরে তিনি ২৪৩টি নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করে স্থানীয় মানুষের কাছে মানবিক সেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নারী চিকিৎসক হিসেবে তিনি অনেকের কাছেই ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দরিদ্র পরিবারের প্রসূতি নারীদের সিজারিয়ান অপারেশনের অতিরিক্ত খরচ ও শারীরিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সহায়তা করছেন তিনি।
গত দুই বছর ধরে দিন-রাতের হিসাব না কষে গ্রামের কাঁচা-মেঠো পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে যাচ্ছেন প্রসব বেদনায় কাতর সন্তানসম্ভবা নারীদের কাছে। কখনো গভীর রাত, কখনো ঝড়-বৃষ্টি—যখনই ডাক আসে, তখনই পৌঁছে যান তিনি। তার সেবায় ইতোমধ্যে অসংখ্য মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
চরাঞ্চলের এসব ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে। দু-একজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও নারী চিকিৎসকের ঘাটতি ছিল প্রকট। সেই শূন্যতাই অনেকটা পূরণ করেছেন রিমা আক্তার। নরমাল ডেলিভারিকে গুরুত্ব দিয়ে তার এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের আস্থার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও আলোচনায় এসেছে।
গলাচিপা উপজেলা সদর হাসপাতাল থেকে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। ট্রলার বা লঞ্চে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে এবং বিকেল ৫টার পর নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ঝড়-বৃষ্টির সময় উত্তাল নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে জরুরি প্রসব সেবার ক্ষেত্রে এই দুই ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
এই বাস্তবতায় গত দুই বছরে ডা. রিমা যেসব বাড়িতে নরমাল ডেলিভারি করাতে গিয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রে কোনো মা বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে স্থানীয়রা জানান। নামমাত্র খরচে ২৪ ঘণ্টা ফোন পেলেই ছুটে যান তিনি। মানবিক এই সেবাকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও নেশা হিসেবে নিয়েছেন।
ডা. রিমা জানান, ২০২০ সালে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সে সময় তিনি ফরিদপুর সরকারি ম্যাটসের ছাত্রী ছিলেন। ম্যাটস শেষ করে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নি সম্পন্ন করেন। পরে পটুয়াখালী ও গলাচিপায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
২০২৪ সালে প্রথম শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। গভীর রাতে পাশের এক আত্মীয় প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। স্থানীয় এক দাই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু রাত আড়াইটায় নদীপথ পাড়ি দেওয়া এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তা সম্ভব ছিল না। খবর পেয়ে রিমা সেখানে গিয়ে সফলভাবে নরমাল ডেলিভারি করান।
সেই ঘটনার পর থেকেই এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করেন তিনি। এরপর থেকে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের কোথাও প্রসব বেদনা উঠলে প্রথমেই ডাকা হয় তাকে। প্রথম ছয় মাসেই তিনি ৯০টি নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করেন এবং গত দুই বছরে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪৩-এ।
ডা. রিমার বাবার বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলায়। তিনি আয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোকলেছুর রহমানের মেয়ে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে উপকূলের দুর্গম চরাঞ্চলে অসহায় প্রসূতি মায়েদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সেবার যে নজির স্থাপন করেছেন ফাতিমা আক্তার রিমা, তা স্থানীয় মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। দুর্গম চরাঞ্চলে মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় অবদান রাখায় স্থানীয়রা তাকে “নারী শক্তির প্রতীক” হিসেবে দেখছেন।
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।