মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

উদাসীনতার কারণে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ড

মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ | প্রকাশিত: ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৫৬

মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ। গ্রাফিক্স | নিউজফ্ল্যাশ সেভেন্টিওয়ান

রাজধানীসহ সারাদেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা নগর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সর্বশেষ ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের একটি বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানিয়েছেন, ভবনটির সিঁড়িতে বিপজ্জনকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ে।

ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্তাধীন থাকলেও ভবনটিতে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না—সে প্রশ্ন উঠেছে। সিআইডি জানিয়েছে, কেমিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে আগুনের উৎস শনাক্তের কাজ চলছে।

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে—

বসুন্ধরা সিটি (২০০৯, ২০১৬): ২০০৯ সালের অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৭ জন। ২০১৬ সালেও একই ভবনে আবার আগুন লাগে।
নিমতলী ট্র্যাজেডি (২০১০): রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণ থেকে আগুন ছড়িয়ে ১২৪ জন নিহত হন, আহত হন অর্ধশতাধিক।
চকবাজার চুড়িহাট্টা (২০১৯): ভয়াবহ আগুনে ৭১ জনের মৃত্যু হয়, শতাধিক আহত হন।
বনানী এফআর টাওয়ার (২০১৯): বহুতল ভবনে আগুনে নিহত হন ২৬ জন, আহত প্রায় ৭০।
মগবাজার বিস্ফোরণ (২০২১): বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১২ জন, আহত দুই শতাধিক।

এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডে হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। কড়াইল, পল্লবী, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।

২০২৩ সালে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে ভয়াবহ আগুনে প্রায় ৩ হাজার ৮৪৫ ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারান; ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০৫ কোটি টাকা। একই মাসে নিউ সুপার মার্কেটের আগুনে ২২৬টি দোকান পুড়ে যায়, ক্ষতি প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে রয়েছে ভবনের নকশা ত্রুটি, অনুমোদনহীন ব্যবহার, বৈদ্যুতিক গোলযোগ, গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকিপূর্ণ সংরক্ষণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনটিও অফিস হিসেবে অনুমোদন পেলেও সেখানে অনুমতি ছাড়াই একাধিক রেস্তোরাঁ চালু ছিল। ভবনে ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা ছিল না।

ফায়ার সার্ভিস পূর্বে একাধিকবার ঝুঁকির নোটিশ দিলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ মৃত্যু হয়েছে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় ও শ্বাসরোধে।

বিশ্লেষকদের মত, নিয়মিত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ এবং অনুমোদনবহির্ভূত ব্যবহার বন্ধ না হলে অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করলে প্রাণহানির মিছিল থামবে না বলেও সতর্ক করছেন সংশ্লিষ্টরা।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top