আসন ভাগাভাগি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ইসলামপন্থী জোট, জামায়াত- ইসলামী আন্দোলনের সমঝোতায় ফাটল
রাজনীতি ডেস্ক | প্রকাশিত: ৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিনের আলোচনা সত্ত্বেও ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। প্রায় সাড়ে তিন মাস একসঙ্গে কাজ করলেও নির্বাচনের একেবারে দোরগোড়ায় এসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই পীরের দল) মধ্যে সমঝোতায় ফাটল দেখা দিয়েছে। জোটগত বোঝাপড়া আদৌ কার্যকর হবে কি না—তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। তবে জোটসংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, চলতি সপ্তাহেই এ অনিশ্চয়তার অবসান হতে পারে।
জামায়াতের প্রস্তাব ও শরিকদের আপত্তি
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখার প্রস্তাব দেয়। বাকি আসনগুলো শরিক দলগুলোর মধ্যে বণ্টনের কথা বলা হয়। সে হিসাবে জামায়াতের পর সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার কথা ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাম প্রস্তাব করা হয়।
তবে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এ প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। দলটির নেতারা বলছেন, সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের অবস্থান বিবেচনায় তাদের আরও বেশি আসন পাওয়া উচিত। বিশেষ করে তুলনামূলক নতুন দল এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার প্রস্তাবে তারা ক্ষুব্ধ।
ইসলামী আন্দোলনের মতে, এনসিপিকে অযথা বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও।
শেষ মুহূর্তে নতুন দল যুক্ত হওয়ায় অসন্তোষ
জোট গঠনের প্রাথমিক ধাপে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ মোট আটটি দল আসন ভাগাভাগির আলোচনায় ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়ের এক দিন আগে, ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যুক্ত হয়। একই রাতে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ার খবর আসে। এতে জোটে শরিক দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১টি।
ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, নতুন তিনটি দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাদের দাবি, জামায়াতের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই বর্তমান অস্বস্তি ও অসন্তোষের মূল কারণ।
সর্বশেষ প্রস্তাব ও আসন বণ্টন
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৮ ডিসেম্বর ১১ শরিক দলের মধ্যে সর্বশেষ দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি ও এলডিপি একযোগে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জোটে যুক্ত হয়েছে। পরে এবি পার্টির যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী—
-
জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি আসন
-
এনসিপিকে ৩০টি
-
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি
-
খেলাফত মজলিসকে ৩টি
-
এবি পার্টিকে ৩টি
-
এলডিপিকে ২টি
-
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টিকে (জাগপা) ৩টি
-
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (বিডিপি) ২টি আসন দেওয়ার কথা বলা হয়।
আলাদা আলাদা প্রার্থী, দ্বন্দ্ব স্পষ্ট
চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর জামায়াত ২৭৬টি আসনে প্রার্থী দেয়। ইসলামী আন্দোলন মনোনয়ন জমা দেয় ২৬৮টি আসনে। এ ছাড়া—
-
এনসিপি: ৪৪টি
-
এবি পার্টি: ৫৩টি
-
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ৯৪টি
-
খেলাফত মজলিস: ৬৮টি আসনে প্রার্থী দেয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও জোটসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেসব আসন ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একইভাবে, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও জামায়াতের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে মনোনয়ন দিয়েছেন।
জামায়াত যে ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, সেগুলোর বেশিরভাগই এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক এবং কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনের জন্য জামায়াত প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনও তাদের বরাদ্দ পাওয়া আসনগুলোতে প্রার্থী রেখেছে। দলের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে জামায়াতের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নেতাদের বক্তব্য
সমঝোতার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,
“মনোনয়ন যাচাই শেষ হলে আমরা আবার বসব। আশা করছি, এই সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি চূড়ান্ত করে ঘোষণা দিতে পারব।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন,
“আমরা একটি জোট হিসেবে নির্বাচন করছি। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জোট অটুট রাখতে প্রয়োজনে ছাড় দিতে আমরা প্রস্তুত।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন,
“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখনো জোট ভাঙেনি। কেউ বহিষ্কৃত হয়নি, কেউ বেরিয়েও যায়নি। আমরা সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। তবে কেউ যদি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করে, তাহলে সম্মিলিত পথচলা কঠিন হয়ে পড়বে।”
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।