কিলিমানজারো ট্রেকের অভিজ্ঞতা:
৫৭৫৬ মিটার উচ্চতার স্টেলা পয়েন্টে পৌঁছানোর গল্প
ইফতেখারুল ইসলাম | প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০৩
মাঝরাতে সামিট পুশে যাত্রা শুরু করার পর প্রথম দিকে অন্ধকারে কিছুটা একা এবং দিকভ্রান্ত লাগছিল। দিনের আলো, গাইডদের উত্সাহ আর কাছাকাছি অন্য কয়েকজন সঙ্গীকে পেয়ে সেই অনিশ্চয়তা কেটে যায়। এরপর আবার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাঁটতে থাকি। মাঝে মাঝে থামি; অন্য সবাই পাথরের ওপর বসে বিশ্রাম নেন, আর আমি বড় পাথরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিই। ক্লান্ত শরীরে বসলে দ্রুত উঠে চলা কঠিন, তাই দাঁড়িয়েই নিজেকে কিছুটা শান্ত করি।
কিছুক্ষণ পরপর হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, এ পথ হয়তো কোনো দিন শেষ হবে না। ঠিক তখন অল্প দূরে কিছু মানুষের ছোট জটলা দেখতে পাই। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছাই সেই জায়গায়।
৫ আগস্ট, সকাল পৌনে নয়টা: আমরা পৌঁছাই কিলিমানজারোর অন্যতম শিখর স্টেলা পয়েন্টে, যার উচ্চতা ৫৭৫৬ মিটার।
সবাই বেশ ক্লান্ত। কারও কারও খিদে লাগেছে। আমাদের দলের অণু তারেক জানালেন, তিনি উহুরু পিক পর্যন্ত যেতে আগ্রহী নন। আমি বলি, “সবার সিদ্ধান্তই সঠিক। যদি একজনও বাকি ১০০ মিটার যেতে চান, আমি যাই।” সবাই একমত হয়ে স্টেলা পয়েন্টে দাঁড়িয়ে গ্রুপ ছবি তুলি। পায়ের কাছে সামান্য তুষার, সেখানেই ছবি তুলি এবং খাবার বের করি—বাদাম, খেজুর, চকলেট, প্রোটিন বার ও বিস্কুট।
নেমে আসার পথও সহজ ছিল না। পাথরের গুঁড়া আর ধুলিময় ৪৫ ডিগ্রি খাড়া পথ ধরে নামা অত্যন্ত কঠিন। এ সময় এরিক ও হাফিজ দুই পাশে থেকে আমাকে ধরে সাহায্য করেন। দুবার হড়কে পড়ে গিয়ে হাতে ও পায়ে ব্যথা লাগে। জামাকাপড়ের স্তরগুলো ভেদ করে কনুই থেকে রক্ত বের হয়। তবে কিছুটা নেমে আসার পর আবার উদ্দীপনা ফিরে আসে, কারণ যত নিচে নামি, অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে শ্বাস নেওয়া সহজ হয়ে যায়।
ছয় দিন ট্র্যাকিংয়ের পথ ফেরার সময় দুই দিনে পার করতে হলো। ৫৭৫৬ মিটার থেকে ৩৮২০ মিটার পর্যন্ত নামতে হয়। অ্যাপল ওয়াচের চার্জ শেষ হওয়ায় দৈর্ঘ্য হিসাব ধরা সম্ভব হয়নি, তবে মোবাইলের স্টেপস অ্যাপ দেখাচ্ছে প্রায় ৩৭,২০০ স্টেপস।
পরের দিন পায়ের আঙুলে ক্ষত ও ব্যথা নিয়ে যাত্রা শুরু করি। বৃষ্টিবেজা পথে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা। নানা রঙের ফুল, পাখির ডাক, সাদা রোমশ লেজ ঝুলিয়ে গাছের ওপর বসে থাকা কলোবাস বানরের দল—সব কিছুই চোখে ধরা দেয়। এরপর মিলেনিয়াল ক্যাম্প, গেট দিয়ে বেরিয়ে বাসে উঠি।
এরপরের চার দিন কাটে তানজানিয়ার তারাঙ্গিরি ও সেরেঙ্গেটি জাতীয় উদ্যানে আফ্রিকার বন্যপ্রাণী ও পাখি দেখার মধ্যে। গোরংগোরো ক্রেটার এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠে। সাফারি থেকে ফিরে আরুশা শহরে কিছু দিন কাটাই। মাসাইদের হাতে তৈরি কারুশিল্পের বাজারে ঘুরে গল্পের মধুর সময়। সেদিন বিকেলে হোটেলে হাতে তুলে দেওয়া হয় কিলিমানজারো আরোহণের সার্টিফিকেট।
দেশে ফেরার পর অনেকদিন লেখা শুরু করতে পারিনি। ছবিতে বোঝানো যায়নি আফ্রিকার সৌন্দর্য, কিলিমানজারোর একলা হিমবাহ, পাহাড়ের বিপুল বিস্তার। বুকের ভেতরে জমে আছে পর্বত, গিরিপথ, হিমবাহ, ঘাসের প্রান্তর ও দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখা কিলিমানজারো। এখনো রাতে মনে হয় খোলা আকাশ, মলিন মায়াময় চাঁদ এবং মিটিমিটি করে জ্বলা নক্ষত্রের নিচে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছি।
লেখক: ইফতেখারুল ইসলাম
আকাশে নক্ষত্র, হিমবাহ আর আফ্রিকার বননদীর ছোঁয়া
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।