রোজা ভেঙে গেলে কখন কাজা, কখন কাফফারা? জেনে নিন শরিয়তের বিধান

ধর্ম ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩১

ছবি: সংগৃহীত

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)

তবে বিশেষ কোনো কারণ বা অনিবার্য পরিস্থিতিতে রোজা রাখা সম্ভব না হলে কিংবা রোজা ভেঙে গেলে শরিয়তে কাজা ও কাফফারার বিধান রয়েছে।

কাজা ও কাফফারা কী?

রমজানের একটি রোজা ছুটে গেলে পরে তার পরিবর্তে একটি রোজা রাখাকে কাজা বলা হয়। আর কাফফারা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করার কারণে নির্ধারিত শাস্তিমূলক বিধান।

কাফফারার নিয়ম হলো- একটি রোজার কাজা আদায়ের পাশাপাশি টানা ষাটটি রোজা রাখা। অর্থাৎ মোট একষট্টি রোজা আদায় করতে হয়।

যদি কেউ শারীরিকভাবে এত রোজা রাখতে অক্ষম হন, তবে ষাটজন মিসকিনকে দুই বেলা তৃপ্তিসহ খাবার খাওয়াতে হবে অথবা একজন দরিদ্রকে ষাট দিন খাবার দিতে হবে।

শরিয়তসম্মত কারণে রোজা না রাখার অনুমতি

ইসলামে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য কিছু ক্ষেত্রে রোজা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজটাই চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)

যেসব কারণে শুধু কাজা করতে হবে

কিছু ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে গেলে বা রাখা সম্ভব না হলে শুধু কাজা করলেই যথেষ্ট, কাফফারা দিতে হয় না।

অসুস্থতা ও সফর: অসুস্থ ব্যক্তি বা সফরে থাকলে রোজা না রেখে পরে কাজা করতে পারবেন।

গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা: নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে রোজা পরে কাজা করা যাবে।

নারীদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক ও প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব চলাকালে রোজা রাখা নিষেধ। পরে কাজা করতে হবে।

জোরপূর্বক রোজা ভঙ্গ: কাউকে জোর করে রোজা ভাঙতে বাধ্য করলে পরে কাজা করতে হবে।

জীবননাশের আশঙ্কা: প্রাণ বাঁচানোর জন্য রোজা ভাঙতে হলে পরে কাজা করতে হবে।

সাময়িক মানসিক অসুস্থতা বা অজ্ঞান হওয়া: সুস্থ হওয়ার পর কাজা আদায় করতে হবে।

ভুলবশত কিছু গিলে ফেলা: অজু বা গোসলের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি গলায় চলে গেলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা করতে হয়।

এ ছাড়া দাঁত থেকে বের হওয়া রক্ত বেশি হয়ে গিলে ফেললে, নাক বা কানে দেওয়া তরল ওষুধ গলার ভেতরে চলে গেলে, হস্তমৈথুন করলে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে রোজা ভেঙে যায় এবং পরে কাজা করতে হয়।

যেসব কারণে কাজা ও কাফফারা দুটোই দিতে হবে

শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেললে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয়।

ইচ্ছাকৃত পানাহার: কোনো কারণ ছাড়া রোজা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া বা পান করলে কাজা ও কাফফারা দিতে হবে।

স্বামী-স্ত্রীর সহবাস: রমজানের দিনে রোজা অবস্থায় সহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর কাজা ও কাফফারা ওয়াজিব হয়।

তবে পানাহার বা সহবাস ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙলে কাফফারা নয়, শুধু কাজা করতে হবে।

কাজা রোজা আদায়ের নিয়ম

কাজা রোজা সাধারণ রোজার মতোই রাখতে হবে। একাধিক রোজা কাজা হয়ে থাকলে ধারাবাহিকভাবে রাখা বাধ্যতামূলক নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে রাখা উত্তম।

নাবালেগ শিশু রোজা রেখে ভেঙে ফেললে তার ওপর কাজা বা কাফফারা কোনোটিই ওয়াজিব হবে না।

কাফফারা আদায়ের নিয়ম

কাফফারার রোজা টানা ষাট দিন রাখতে হবে। মাঝখানে একদিন বাদ পড়লে আবার শুরু থেকে রোজা রাখতে হবে।

নারীদের ক্ষেত্রে কাফফারা আদায়ের সময় মাসিক শুরু হলে পবিত্র হওয়ার পর আবার রোজা রাখা শুরু করতে হবে।

মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো

ষাটজন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়ালে কাফফারা আদায় হবে। প্রত্যেককে ফিতরা পরিমাণ গম বা তার সমমূল্যের অর্থও দেওয়া যেতে পারে।

তবে ষাট দিনের ফিতরা একদিনে দেওয়া যাবে না। প্রতিদিন দিতে হবে অথবা আলাদা ষাটজনকে দিতে হবে।

একই রমজানে একাধিক রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙলেও একটি কাফফারা যথেষ্ট।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়

কাফফারা বা ফিদিয়া শুধু তাদেরকেই দেওয়া যাবে, যাদের জাকাত দেওয়া যায়- যেমন ফকির, মিসকিন ও ঋণগ্রস্ত মানুষ।

হাদিসে বলা হয়েছে, শরিয়তসম্মত কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া কেউ যদি রমজানের একটি রোজা ভেঙে ফেলে, তাহলে সারা জীবনের রোজাও সেই একটি রোজার সমপর্যায়ের মর্যাদা অর্জন করতে পারবে না।

রমজানের রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকা এবং কোনো কারণে রোজা ছুটে গেলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কাজা বা কাফফারা আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

এনএফ৭১/একে



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top