রক্তিম বিদায়ে ২০২৫, স্বপ্নের হাতছানায় ২০২৬
এজেড | বিশেষ নিবন্ধ | প্রকাশিত: ১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৫৪
পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুবে গেছে ২০২৫ সালের শেষ সূর্য। বিদায় ঘণ্টা বেজেছে পুরনো বছরের, স্মৃতির পাতায় জমা পড়েছে সুখ-দুঃখের নানা অম্ল-মধুর মুহূর্ত। পেছনে পড়ে রইল সাক্ষী হয়ে থাকা বহু ভাঙা-গড়ার এক উত্তাল ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের মানুষ আজ আরও একটি নতুন বছরে পা রাখছে; তবে এই পথচলা নিছক সময়ের আবর্তন নয়, বরং দু’চোখ ভরা এক বুক বড় স্বপ্নের হাতছানি।
শোকাতুর বিদায় ও জাতীয় হাহাকার
বছরের বিদায়বেলায় এক অভূতপূর্ব শোকাতুর পরিবেশ গ্রাস করেছে পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি প্রাণ। এ দেশের মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার যে উচ্চ আসনে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে বিদায়বেলার সেই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায়। গভীর মমতা ও পরম শ্রদ্ধায় মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানিয়েছে।
একইসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার ঘটনায় শোকের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে সেই তরুণ সমাজকে, যারা কোনো অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ছায়ায় মাথানত করতে রাজি ছিল না। ২০২৫ সালের এসব বিসর্জন কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় সত্তার গভীরে গেঁথে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য ক্ষত।
জাগরণ ও আত্মত্যাগের মহাকাব্য
২০২৫ সাল ছিল মূলত এক অদম্য প্রতিরোধ ও জাগরণের বছর। রূপান্তরের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না; এই সংগ্রামও তার চরম মূল্য নিয়েছে। শূন্য হয়েছে বহু মায়ের কোল, প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে হাহাকার করছে অসংখ্য ঘর। শরীরের দৃশ্যমান ক্ষত আর মনের গহীনে জমে থাকা অদৃশ্য দাগগুলো আজ হয়ে উঠেছে অপরাজেয় সাহসিকতার জীবন্ত পদক।
তবুও শোকের এই দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে জাতি আজ এক অমোঘ গর্বে বুক বাঁধছে। শহীদদের রক্তে প্রাণ সঞ্চার হয়েছে নতুন যুগের শিকড়ে। ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক মহাবিপ্লবের দোরগোড়ায়। পুরোনো, ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতিটি ফাটল আজ হয়ে উঠেছে নতুন সৃষ্টির উর্বর ভূমি। যেখানে একসময় দুর্নীতির রাজত্ব ছিল, সেখানে আজ রোপিত হচ্ছে ন্যায়বিচারের চারা; যেখানে ছিল হতাশা, সেখানে ডানা মেলছে নতুন সম্ভাবনা।
২০২৬: পুনর্জন্মের নতুন ভোর
২০২৬ সালের ভোরের প্রথম আলো যেন দীর্ঘ বিরহের পর এক পরম মমতাময়ী সন্ধি। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের প্রতীক। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিলে প্রকম্পিত হতো, সেখানে এখন পড়বে আগামীর স্বপ্নদ্রষ্টা ও কারিগরদের দৃঢ় পদচারণা।
বিশেষ করে তরুণ সমাজ—যারা ছিল এই গণজাগরণের হৃৎস্পন্দন—তারাই আজ আগামীর আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের প্রধান কারিগর হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে এক আলোকিত ভবিষ্যতের পথে। প্রতিটি নতুন সূর্য বাংলাদেশকে দেখাবে উন্নতির নতুন দিগন্ত, ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করবে মানুষে মানুষে।
২০২৬ সালের এই সূচনা এক পবিত্র অঙ্গীকার—এই জাতি এখন আর কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অদম্য সাহসে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: নতুন প্রারম্ভের অপেক্ষা
একইসঙ্গে ২০২৬ সাল সামনে এনে দিয়েছে এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিহাসের অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে যাচ্ছে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়।
বাংলাদেশ আজ তার সোনালি ভবিষ্যতের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলেছে। ২০২৫ সালের প্রতিটি ত্যাগ ও বিসর্জন আজ রূপ নিতে চলেছে ন্যায়বিচার, সাম্য ও সমৃদ্ধির শক্ত ভিত্তিতে। অন্ধকার পেরিয়ে যে নতুন সূর্যের উদয় হয়েছে, তা এ দেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি ও আশার অবিনশ্বর শক্তিরই এক জীবন্ত দলিল।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।