শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩

বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ: ভারতীয় বাহিনীর ঐতিহাসিক পরাজয়ের দলিল

নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩৫

ছবি: সংগৃহীত

আজ ১৮ এপ্রিল, বড়াইবাড়ী দিবস। ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী সীমান্তে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। সেই যুদ্ধে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (সীমান্তরক্ষী বাহিনী) কাছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়ে। দিনটি বাংলাদেশের সীমান্ত ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

জানা যায়, ওইদিন ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্যের একটি যৌথ দল কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড়াইবাড়ী এলাকায় প্রবেশ করে।

এ সময় স্থানীয় কৃষক মিনহাজ উদ্দিন ভোরে ধানক্ষেতে সেচ দিতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক বিদেশি সেনার উপস্থিতি দেখতে পান। তারা তার কাছে ক্যাম্পের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি কৌশলে ভুল দিক নির্দেশ করে দ্রুত বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পে খবর দেন।

খবর পেয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত প্রস্তুতি নেন এবং পাশের দুইটি ক্যাম্পেও সতর্কতা পাঠান। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ভারতীয় বাহিনী পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে গুলি চালিয়ে আক্রমণ শুরু করে। শুরুতেই শহীদ হন ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় সকাল ১০টার দিকে, যখন জামালপুর অঞ্চলের রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। দুই দিনব্যাপী এই সংঘর্ষে আরও দুইজন বাংলাদেশি সৈনিক শহীদ হন—সিপাহী আব্দুল কাদের ও সিপাহী মাহফুজুর রহমান।

অন্যদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৬ জন সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। যদিও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ ছাড়া দুইজন ভারতীয় সৈনিককে জীবিত আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ।

পরবর্তীতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহ ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ঘটনার পেছনের ইতিহাসে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট অঞ্চলের পাদুয়া এলাকায় একটি মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার পর ওই এলাকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন বিরোধ চলে আসছিল।

১৯৯৯ সালে সীমান্ত বৈঠকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী পাদুয়া এলাকায় অবস্থান নেয় এবং ক্যাম্প স্থাপন করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৮ এপ্রিল বড়াইবাড়ীতে হামলা চালায় ভারতীয় বাহিনী।

এই যুদ্ধে বাংলাদেশের তিনজন সৈনিক শহীদ হন এবং অন্তত ১২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ছিলেন হাবিলদার আব্দুল গণি, সিপাহী জাহিদুর রহমান, নজরুল ইসলামসহ অনেকে।

এছাড়া সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ২৫টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

স্থানীয় বাসিন্দারা আজও সেই ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করেন। তাদের মতে, হঠাৎ আক্রমণ ও গুলিবর্ষণে পুরো এলাকা আতঙ্কে ছেয়ে গিয়েছিল।

স্কুল শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, বড়াইবাড়ীর যুদ্ধ সীমান্ত ইতিহাসে বাংলাদেশের সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে সেই সময় দীর্ঘদিন এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করেছিল।

বড়াইবাড়ীর এই সংঘর্ষ আজও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং প্রতিরোধের এক স্মরণীয় ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এনএফ৭১/একে



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top