নজরদারির ঘাটতিতে দেশের পরিবহন খাত থেকে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:১৩
দেশের পরিবহন খাতে বিদ্যমান দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেট কার—এই পাঁচটি খাত থেকে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তা বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল নজরদারি ও অনিয়মের কারণে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট, আমদানি শুল্ক ও বার্ষিক কর—এসব খাত সরকারের বড় আয়ের উৎস হতে পারত। কিন্তু আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতির প্রধান কারণ হলো নিবন্ধনহীন, ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচল। এর পাশাপাশি রুট পারমিট ছাড়া যান চলাচল এবং কর ফাঁকিও বড় ভূমিকা রাখছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল খাতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও সম্ভাবনা রয়েছে ২ হাজার কোটির বেশি। কিন্তু ফিটনেস ও নিবন্ধন নবায়ন না করা প্রায় চার লাখ মোটরসাইকেলের কারণে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।
সিএনজি ও এলপিজিচালিত থ্রি-হুইলার খাতেও একই চিত্র। বর্তমানে প্রায় ৩৬২ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—মাত্র ১৭.৫ কোটি টাকা আদায়ের বিপরীতে সম্ভাব্য আয় ৯০০ কোটির বেশি।
বাস, মিনিবাস ও ট্রাক খাতেও রুট পারমিট ও ফিটনেস জটিলতার কারণে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাইভেট কার সেগমেন্টেও কর ফাঁকি ও ফিটনেস নবায়নের ঘাটতি লক্ষণীয়।
এই অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। যদিও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা তুলনামূলক কম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচলই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে পুরনো ও দূষণকারী যানবাহন বায়ুদূষণেরও বড় উৎস, যা নগর পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, এবং এ সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, বাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর, ট্রাকের ২৫ বছর এবং থ্রি-হুইলারের ১৫ বছর নির্ধারিত হলেও বাস্তবে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনও নির্বিঘ্নে সড়কে চলাচল করছে।
খাত বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নিবন্ধন, ফিটনেস, কর ও রুট পারমিট—এই চারটি ডেটা এখনো সমন্বিত নয়। ফলে অনেক যানবাহন সহজেই নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তারা বলছেন, সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেইস চালু, ফিটনেস ও নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করা, অনিবন্ধিত যানবাহনকে আইনের আওতায় আনা এবং স্ক্র্যাপনীতি কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট ও নজরদারি জোরদার করাও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবহন খাতই হতে পারে সরকারের অন্যতম বড় রাজস্ব উৎস। কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে সেই সম্ভাবনার বড় অংশই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।