ফিতরা আদায়ের সঠিক সময় ও তাৎপর্য
ধর্ম ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫:৪০
রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দেয়। এই মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি ওয়াজিব ইবাদত হলো সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। অনেকেই একে সাধারণ দান হিসেবে দেখেন, অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এটি রোজার পূর্ণতা ও সমাজকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিধান।
ফিতরার তাৎপর্য-
‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভঙ্গ করা বা সমাপ্ত করা। রমজানের সিয়াম সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত যে দান আদায় করা হয়, সেটিই সাদাকাতুল ফিতর। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরাকে রোজাদারের অনর্থক ও অশোভন কথাবার্তার প্রায়শ্চিত্ত এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
অর্থাৎ ফিতরার মধ্যে দুটি বড় উদ্দেশ্য নিহিত- একটি আত্মিক, অন্যটি সামাজিক। একদিকে এটি রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা, অন্যদিকে ঈদের দিনে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর ব্যবস্থা।
কখন ফিতরা ওয়াজিব হয়?
ফিকহবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ আলেমের মত হলো- ঈদুল ফিতরের দিন ফজরের সময় থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। যে ব্যক্তি ঈদের দিনের ফজরের সময় জীবিত এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার ওপর ফিতরা আদায় করা আবশ্যক।
যদি কেউ ঈদের দিনের ফজরের আগে ইন্তেকাল করেন, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব নয়। আবার ঈদের ফজরের পর জন্মগ্রহণকারী সন্তানের পক্ষ থেকেও ফিতরা ওয়াজিব হয় না।
ফিতরা আদায়ের উত্তম সময়-
সুন্নাহ অনুসারে ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের নামাজে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর পেছনে গভীর হিকমত রয়েছে। যাতে দরিদ্ররা ঈদের দিন অভাবগ্রস্ত না থাকে এবং তারাও আনন্দে অংশ নিতে পারে। যদি কেউ ঈদের নামাজের পরে ফিতরা আদায় করে, তাহলে তা আদায় হয়ে যাবে; তবে সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করার ফজিলত পাওয়া যাবে না।
আর কেউ যদি বিলম্ব করতে করতে ঈদের দিনও তা আদায় না করে, তবে সে গুনাহগার হবে। তবুও ফিতরা তার ওপর ফরজ হিসেবে বাকি থাকবে, যতক্ষণ না আদায় করে।
অগ্রিম আদায়ের বিধান-
সাহাবায়ে কেরামদের কেউ কেউ রমজানের শেষের দুই-এক দিন আগে ফিতরা আদায় করতেন। হানাফি মাযহাবের মতে, রমজানের শুরু থেকেই ফিতরা আদায় করা বৈধ।
বর্তমান সময়ে অনেকেই রমজানের মাঝামাঝি বা শেষ দশকে ফিতরা দিয়ে থাকেন, যাতে দরিদ্র পরিবারগুলো আগে থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারে। এটিও শরীয়তসম্মত।
কার ওপর ফিতরা আবশ্যক?
ফিতরা আদায়ের জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে-
* মুসলিম হওয়া,
* নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া,
* নিজের পাশাপাশি নাবালক সন্তানের পক্ষ থেকে আদায় করা।
স্বামী স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিতরা দিতে বাধ্য নন; তবে চাইলে তা আদায় করতে পারেন।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি নেসাবের মালিক না হন, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব নয়। গর্ভের সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া আবশ্যক নয়, তবে দিলে নফল হিসেবে সওয়াব হবে।
ফিতরার পরিমাণ-
হাদিসে এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্যশস্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এক সা’ প্রায় আড়াই থেকে তিন কেজির সমপরিমাণ। গম, যব, খেজুর ও কিশমিশের মতো প্রচলিত খাদ্যশস্যের মাধ্যমে এটি আদায় করা যায়।
বর্তমানে অনেক দেশেই বাজারমূল্য অনুযায়ী অর্থ প্রদান করা হয়। আলেমদের মতে, যদি নগদ অর্থ প্রদান দরিদ্রের জন্য বেশি উপকারী হয়, তবে তা দেওয়া জায়েজ।
ফিতরার সামাজিক ও আত্মিক প্রভাব-
ফিতরা রোজাকে পরিশুদ্ধ করে। মানুষ হিসেবে রোজার সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল হওয়া স্বাভাবিক। ফিতরা সেই ত্রুটির প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ।
একই সঙ্গে এটি সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম চায় না ঈদের দিন কেউ অভুক্ত থাকুক। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমাতে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করতে ফিতরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফিতরা আদায়ে সচেতনতা-
অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের নামাজের পর হঠাৎ ফিতরার কথা মনে পড়ে। এটি অনভিপ্রেত। পরিকল্পিতভাবে আগেই হিসাব করা, পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং ঈদের আগেই বিতরণ নিশ্চিত করা উচিত।
স্থানীয় দরিদ্র ও মিসকিনদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সঠিকভাবে বিতরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
উপসংহার-
ফিতরা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রমজানের পূর্ণতার প্রতীক। এটি আত্মশুদ্ধির ইবাদত, আবার সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অনুশীলন।
ঈদের নামাজের আগে যথাযথভাবে ফিতরা আদায় করলে তবেই রমজানের ইবাদত পরিপূর্ণতা পায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক সময় ও সঠিক পদ্ধতিতে ফিতরা আদায়ের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সকল ইবাদত কবুল করুন।
এনএফ৭১/একে
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।