রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

জেলে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের ইঙ্গিত

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি | প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০৩

জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বকনা বাছুর বিতরণ । ছবি: নিউজফ্ল্যাশ সেভেন্টিওয়ান

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় দেশীয় প্রজাতির মাছ শামুক সংরক্ষণ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বকনা বাছুর বিতরণে অনিয়ম সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার (মার্চ) কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিবন্ধিত ৬০ জন জেলের মাঝে একটি করে বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়। তবে সুফলভোগীদের অভিযোগ, বিতরণ করা বেশিরভাগ বাছুরই ছিল রোগাক্রান্ত, আকারে ছোট এবং প্রকল্পের নির্ধারিত ওজন অনুযায়ী নয়।

এছাড়া নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যেও অনেকেই প্রকৃত জেলে নন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সুবিধা পাওয়ার জন্য উপজেলা মৎস্য বিভাগের সহায়তায় অনেকেই জেলে হিসেবে নিবন্ধন নিয়েছেন।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল জেলে পরিবারের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা এবং মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। গবাদি পশু পালন দুধ উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার থেকে বিরত রাখা ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য। বিশেষ করে জাটকা মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ শামুক রক্ষায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে সুফলভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিতরণ করা বেশিরভাগ বকনা বাছুর দেশীয় জাতের, অনেকগুলো রোগাক্রান্ত এবং ওজনেও কম। বাছুরগুলোর বাজারমূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং ওজন ছিল ৫০ থেকে ৫৫ কেজির মধ্যে। অথচ প্রকল্প অনুযায়ী বাছুরের ওজন অন্তত ৬৫ কেজি হওয়ার কথা।

সিংগা ইউনিয়নের বাসিন্দা তপন রায় বলেন, লটারির মাধ্যমে বাছুর দেওয়া হয়। বাড়িতে আনার পর দেখা যায় বাছুরের পায়ে পচন ধরেছে। চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। চিকিৎসার জন্য সুদে টাকা এনে ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। তবে ভয়ে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানাতে পারেননি বলে জানান তিনি।

একই ইউনিয়নের সুভাষ ঢালীর স্ত্রী জানান, বাড়িতে আনার সময়ই বাছুরটি অসুস্থ ছিল। বিভিন্নভাবে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।

পারুলিয়া ইউনিয়নের বেলাল ঠাকুর বলেন, তিনি যে বাছুরটি পেয়েছেন তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত রয়েছে। তবে তিনি পেশায় কৃষক এবং গরিব হিসেবে এই সহায়তা পেয়েছেন বলে জানান।

বেথুরী ইউনিয়নের লিমন সরদার বলেন, মৎস্য অফিসের মাধ্যমে একটি বাছুর পেয়েছেন, যার ওজন প্রায় ৫০ কেজি।

এছাড়া জামাল মোল্লা, বিপদ বিশ্বাস, চুনে পোদ্দার, কাঞ্চন শেখ, বিকর্ন দীপক মল্লিকসহ অনেক সুফলভোগী জানান, ৬০টি বাছুরের মধ্যে কয়েকটি আকারে ছোট ওজনে কম থাকায় প্রথমে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে সেগুলো আবার বিতরণ করা হয়। অনেকে নিতে না চাইলে মৎস্য অফিস থেকে জানানো হয়, না নিলে প্রকল্প ফেরত চলে যাবে। পরে বাধ্য হয়ে তারা বাছুর গ্রহণ করেন।

বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিচুর রহমান প্রধান মুঠোফোনে জানান, প্রকল্পের সবকিছু প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে নির্ধারণ করা হয়। তার তেমন কোনো দায়িত্ব ছিল না। অসুস্থ গরুর বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শুভঙ্কর দত্ত বলেন, বকনা বাছুর বিতরণের সময় সবগুলোই সুস্থ ছিল। পরে কোনো সমস্যা হলে তাদের সহায়তায় চিকিৎসা নেওয়া যেত।

গোপালগঞ্জ জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক খালিদুজ্জামান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বকনা বাছুরের ওজন অন্তত ৬৫ কেজি হতে হবে এবং প্রতি বাছুরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। বিতরণের সময় উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী বাছুর বুঝে নেবেন।

কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিন মিয়া বলেন, নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। তবে কেউ যদি প্রকৃত জেলে না হয়েও জেলে কার্ড নিয়ে সুবিধা পেয়ে থাকে কিংবা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল প্রকৃত জেলেদের দাবি, প্রকৃত সুফলভোগীরা যদি সুবিধা না পান তাহলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হবে এবং এতে সরকারের অর্থের অপচয় হবে।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top