সংকটে সামনে এলো জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর পরিস্থিতি
বানিজ্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ৯ মার্চ ২০২৬, ১৩:০৮
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুতের অভাব এবং আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের জ্বালানি তেল শোধনাগারের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ফলে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, দেশে জ্বালানির মজুত তুলনামূলকভাবে সীমিত। মার্চ মাসের শুরুতে মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৫ শতাংশ জুড়ে থাকা ডিজেলের মজুত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ২৭টি ডিপো রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি নদীভিত্তিক, ৯টি রেলভিত্তিক এবং ২টি বার্জ ডিপো। এসব ডিপোর মাধ্যমে প্রায় ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন ডিজেল, ৫৩ হাজার ৬১৬ টন পেট্রোল এবং ৩৭ হাজার ১৩ টন অকটেন সংরক্ষণ করা সম্ভব।
গড় দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী এই মজুত দিয়ে দেশের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিনের চাহিদা পূরণ করা যায়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হওয়ার পর ডিজেলের মজুত সাময়িকভাবে মাত্র ১৫ দিনের সমপরিমাণে নেমে আসে। পরে তা আরও কমে প্রায় ১১ দিনে দাঁড়ায়, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
নতুন চালান আসার ফলে গতকাল ডিজেলের মজুত কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৪ দিনের সমপরিমাণে দাঁড়িয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আরও কয়েকটি চালান আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ হাজার টন পেট্রোল রয়েছে, যা প্রায় ১৪ দিনের জন্য যথেষ্ট। একই সঙ্গে ২২ হাজার টন অকটেন মজুত রয়েছে, যা প্রায় ২৪ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু চালান আসতে বিলম্ব হলেও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। মার্চ মাসের আমদানি সূচি অনুযায়ী দেশে ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, ৩ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৪৫ হাজার টন জেট জ্বালানি আসার কথা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে যে মজুত রয়েছে তা মূলত কার্যকরী মজুত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কোনো কারণে আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে বড়জোর দুই সপ্তাহের মতো নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেল শোধনাগারগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী জুন মাস পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। তবে কিছু চালান বিলম্বিত হওয়ায় পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিটি যানবাহনের জন্য দৈনিক জ্বালানি গ্রহণের সীমা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল ঢাকার ১৩টি ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে দিনের বেলায় ছয়টিতে জ্বালানি সরবরাহ ছিল না। পরে তেলের ট্রাক পৌঁছানোর পর সন্ধ্যায় তিনটি স্টেশনে পুনরায় বিক্রি শুরু হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসনকে সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু পেট্রোল পাম্প সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি করছে অথবা মুনাফার উদ্দেশ্যে জ্বালানি মজুত করছে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ টহলের অনুরোধও করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, গত সপ্তাহের শেষ দিকে যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছিল তা মূলত হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে হয়েছিল। তবে ডিপোগুলো থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক কৌশলগত জ্বালানি মজুত ব্যবস্থা নেই। এমনকি সীমিত পরিমাণ জরুরি মজুত থাকলেও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা অনেকটা বাড়তে পারত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাজারের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা পেতে অতিরিক্ত ১৫ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, গত এক দশকে জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো সীমিত শোধন সক্ষমতা ও অল্প মজুত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলছে।
১৯৬৩ সালে নির্মিত দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। অথচ বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে থাকে।
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।