রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২

রাজনীতি ছাড়া কি পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভব?

বিশ্ববিদ্যালয় কেন রাজনীতিমুক্ত হতে পারে না

মোসাদ্দেক হোসেন | প্রকাশিত: ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:২৭

গ্রাফিক্স | নিউজফ্ল্যাশ সেভেন্টিওয়ান

বিশ্ববিদ্যালয় কি রাজনীতিমুক্ত রাখা উচিত—এই প্রশ্নটি প্রায়ই ওঠে। অনেকেই মনে করেন, রাজনীতি বাদ দিলেই ক্যাম্পাস হবে শান্ত, পড়াশোনার পরিবেশ হবে নিরবচ্ছিন্ন। কিন্তু সত্যিই কি রাজনীতি বাদ দিলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিপূর্ণ থাকে? উত্তর হলো—না। রাজনীতি নামক সত্তাকে অগোচরে রেখে কখনোই একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না; বড়জোর সেটিকে একটি বিশেষায়িত বা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়: একটি ছায়া রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি

একটি দেশ কল্পনা করুন তার ভূখণ্ড আছে, জনসংখ্যা আছে, সার্বভৌমত্ব আছে; কিন্তু নেই এসবকে সমন্বয় করার রাজনৈতিক কাঠামো। এমন রাষ্ট্র কল্পনাই করা যায় না। অরাজকতা ও স্বেচ্ছাচার সেখানে অবধারিত। ঠিক তেমনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভেতরে একটি ছায়া রাষ্ট্রের মতো।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু বিষয়ভিত্তিক দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীকে সর্বাঙ্গীণভাবে গড়ে তুলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে প্রস্তুত করা। সে কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে সংগঠন, মতাদর্শ, বিতর্ক ও মতপ্রকাশের গুরুত্ব অপরিসীম।

রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল

রাষ্ট্র গঠনের চারটি মৌলিক উপাদান—ভূমি, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। এই চারটি উপাদানই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে নির্দিষ্ট সীমানাবেষ্টিত ক্যাম্পাস—নিজস্ব ভূখণ্ড। রয়েছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী—যারা একটি পূর্ণাঙ্গ জনসংখ্যার প্রতিচ্ছবি। রয়েছে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের কাঠামো—অর্ডিন্যান্স, সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক বিধিবিধান। আর সরকার? ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, ডিন, প্রভোস্ট—প্রতিটি পদ যেন একেকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই ছোট্ট রাষ্ট্রে রাজনীতি থাকবে না কেন?

রাজনীতি ছাড়া গণতন্ত্র অসম্ভব

একটি রাষ্ট্র যেমন রাজনীতি ছাড়া চলতে পারে না, তেমনি একটি পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ও রাজনীতিহীন হতে পারে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়—এখানেই জন্ম নেয় চিন্তা, বিতর্ক, প্রতিবাদ ও নেতৃত্ব।

রাজনীতিই শেখায় ক্ষমতার বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বার্থের সংঘাত ও সমঝোতার প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীরা এখান থেকেই নাগরিক হিসেবে সচেতন হয়ে ওঠে।

বিকৃত রাজনীতি বনাম রাজনীতির অনুপস্থিতি

অনেকে বলেন, ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সিট দখল ও মারামারি হয়। এই অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এগুলো রাজনীতির দোষ নয় এগুলো বিকৃত ও অসুস্থ রাজনীতির ফল।

একটি দেশে দুর্নীতি বা সন্ত্রাস হলে কি আমরা রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলি? না। আমরা বলি সংস্কার আনতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও কেন একই যুক্তি প্রযোজ্য হবে না?

ছাত্রসংগঠন: ক্যাম্পাসের প্রেসার গ্রুপ

রাষ্ট্রে যেমন বিরোধী দল, প্রেসার গ্রুপ ও নাগরিক সমাজ থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রসংগঠনগুলো ঠিক সেই ভূমিকা পালন করে। তারা প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করে এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখে।

রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবি মূলত এই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় এক ধরনের প্রশাসনিক একনায়কতন্ত্রে, যেখানে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়।

গণমাধ্যম ও স্বচ্ছতা

একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন স্বাধীন সাংবাদিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী গণমাধ্যম। রাষ্ট্রে যেমন গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, তেমনি ক্যাম্পাসেও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা অপরিহার্য।

ইতিহাস সাক্ষী ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা

রাজনীতি থাকলে পড়াশোনা নষ্ট হয়—এই যুক্তির বিপরীতে ইতিহাসই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক জুলাই ’২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—সবকিছুর পেছনেই ছিল সংগঠিত ছাত্র রাজনীতি।

শুধু বই পড়ে দেশ বদলায় না। দেশ বদলায় চিন্তা, প্রতিবাদ ও সংগঠনের মাধ্যমে—আর এর জন্য গঠনমূলক রাজনীতি অপরিহার্য।

প্রয়োজন সংস্কার, নিষেধাজ্ঞা নয়

হ্যাঁ, সমস্যা আছে। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি, দখলদারি ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সমাধান রাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়। সমাধান হলো সংস্কার—

  • নির্দলীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা

  • দলীয় প্রভাব ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা

  • শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা

রাজনীতি থাকবে, তবে তা হবে সুস্থ, শিক্ষাকেন্দ্রিক ও গণতান্ত্রিক।

বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিমুক্ত করলে সেটি কেবল ডিগ্রি ছাপানোর কারখানায় পরিণত হয়। তখন তা আর সভ্য সমাজের আয়না, বৃহৎ চিন্তার কেন্দ্র বা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকে না।

আমরা চাই প্রাণোজ্জ্বল ও জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে রাজনীতি থাকবে, থাকবে মতাদর্শ, থাকবে মানবাধিকার, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংগঠন। একমাত্র তখনই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারবে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের প্রকৃত কান্ডারিদের।



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top