আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে ৩০ আসনে নতুন সমীকরণ, টানাপোড়েন বিএনপি–জামায়াতে
নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:২৬
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান লড়াই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হলেও, বাস্তবে অনেক আসনে নির্ধারক হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোটব্যাংক। অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে যেসব আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নিয়মিত জয়ী হয়েছেন, এমন প্রায় ৩০টি আসনে এবার নতুন করে ভোটের হিসাব কষা হচ্ছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং তারা নির্বাচনে না থাকায় ওই ভোট এখন বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেলার প্রতিনিধিদের তথ্য বলছে, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানতে জোর তৎপরতা চলছে। কোথাও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কোথাও প্রভাবশালী নেতাদের কবর জিয়ারত, আবার কোথাও মামলা–হয়রানি থেকে রক্ষার আশ্বাস—এসব কৌশল এখন নির্বাচনী মাঠের আলোচনার কেন্দ্রে।
মাদারীপুরে প্রতীকী বার্তা
আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাদারীপুরের তিন আসনেই এবার ভোটের সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর কবর জিয়ারত করেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তাঁর পক্ষে সমর্থন জানান। নাদিরা আক্তার বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, নিরপরাধদের নিরাপদে এলাকায় ফেরার সুযোগ থাকা উচিত।
মাদারীপুর-২ আসনেও একই ধরনের প্রতীকী তৎপরতা দেখা গেছে। সাবেক এমপি শাজাহান খানের মা–বাবার কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপি ও এক বিদ্রোহী প্রার্থী। স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে, আওয়ামী লীগের কিছু অনুসারী নীরবে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। মাদারীপুর-৩ আসনেও আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীকে বিএনপির প্রচারণায় দেখা গেছে।
শরীয়তপুরে অবস্থান বদল
১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শরীয়তপুরের তিন আসনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও এবার চিত্র ভিন্ন। গত কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। স্থানীয় নেতারা বলছেন, দল থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় এবং এলাকার শান্তি-নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাঁরা নতুন অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপির প্রার্থীরাও উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের আস্থা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গোপালগঞ্জে নীরব সমীকরণ
আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে প্রকাশ্যে দলত্যাগের ঘটনা না থাকলেও ভোট টানার প্রচেষ্টা থেমে নেই। বিএনপি ও অন্য প্রার্থীরা টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতীকী বার্তা দিয়েছেন। প্রার্থীরা বলছেন, হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো নিরীহ ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফরিদপুরে যোগদান ও আশ্বাস
ফরিদপুরের কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিএনপিতে যোগ দিতে দেখা গেছে। বিএনপির প্রার্থীরা আশ্বাস দিচ্ছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ হয়রানির শিকার হবেন না। তাঁদের বক্তব্য—অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে, তবে নিরীহদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
বাগেরহাট ও ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু ভোটে গুরুত্ব
বাগেরহাটে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই সভা-সমাবেশে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় উপস্থিতি থাকায় তাঁদের সঙ্গে মতবিনিময় বাড়িয়েছে দুই দলই। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পৃথকভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
জামালপুর ও ময়মনসিংহে বাস্তবতার রাজনীতি
জামালপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন পদধারী নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন। অন্যদিকে এক আওয়ামী লীগ নেতা জামায়াতের পক্ষে ভোট চাইছেন—যা স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় কর্মীদের ভাষ্য, হয়রানি এড়াতে অনেকেই ‘বাস্তবতা বিবেচনায়’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
ফল নির্ধারণে নির্ণায়ক ভোট
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির অনুপস্থিতি এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছে। এখন প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ভোট কোন দিকে যাবে এবং কতটা যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোটের সরে যাওয়া বা বিভক্ত হওয়াই অন্তত ৩০টি আসনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এনএফ৭১/ওতু
বিষয়:

পাঠকের মন্তব্য
মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।