বৃহঃস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরানের মিত্ররা কোথায়? কেন দূরত্ব বজায় রাখছে রাশিয়া–চীন

নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক | প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০২৬, ১৬:১৮

ইরানের মিত্ররা কোথায়? কেন দূরত্ব বজায় রাখছে রাশিয়া–চীন ।  ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর তেহরানের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক মিত্র রাশিয়া ও চীন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দেশ দুটির পক্ষ থেকে ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যাকে “মানবিক ও নৈতিক সব নিয়মের নির্মম লঙ্ঘন” বলে মন্তব্য করেছেন। একই সময়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে বলেছেন, শক্তি প্রয়োগ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানান।

রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবিও জানিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে ইরান, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তিন দেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষা খাতে সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়।

এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা ও সামরিক সমন্বয়ও বাড়ে। পাশাপাশি ইরানের মাধ্যমে রাশিয়াকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করতে একটি পরিবহন করিডর প্রকল্প নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি ভারত মহাসাগর এলাকায় দুই দেশ যৌথ নৌ-মহড়া চালালেও চুক্তিতে পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ কোনো এক দেশ যুদ্ধে জড়ালে অন্য দেশকে সরাসরি সামরিকভাবে অংশ নিতে হবে—এমন শর্ত এতে রাখা হয়নি।

রুশ বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। কারণ এতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মস্কো নতুন কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।

২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছরের একটি সহযোগিতা চুক্তি করে। এর মাধ্যমে জ্বালানি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা বাড়ানো হয় এবং ইরানকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগে যুক্ত করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমা বজায় রেখেছে। চীনের নীতিগত অবস্থান হলো অন্য দেশের সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা।

এ কারণে চীন সম্ভবত কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশই যায় চীনে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

তবে চীনের বিশাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় ইরান অপেক্ষাকৃত ছোট অংশীদার। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় বেইজিং মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া ও চীন ইরানের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন দিলেও সরাসরি সামরিক সহায়তার পথে হাঁটতে চাইছে না। তারা মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপ সৃষ্টি, মধ্যস্থতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই বর্তমান সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

সূত্র: আল জাজিরা



বিষয়:


পাঠকের মন্তব্য

মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Top